শান্তিপূর্ণ বিচ্ছেদ থেকে সশস্ত্র মুক্তি: বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী রাজনৈতিক মহাপরিকল্পনা

অবশ্যই পরুন

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ সংগ্রাম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁর চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। তবে এই স্বাধীনতা অর্জনে তিনি কোনো হঠকারী পথ বেছে নেননি। তাঁর পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত সুসংহত এবং দূরদর্শী। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন মূলত একটি শান্তিপূর্ণ এবং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে (যেমনটা চেকোস্লোভাকিয়ার ‘ভেলভেট রেভলুশন’-এ দেখা গিয়েছিল) পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া।

এই মহাপরিকল্পনার প্রথম ধাপ ছিল ৬ দফা এবং পরবর্তীতে ছাত্রদের ১১ দফা কর্মসূচি। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা ছিল মূলত স্বাধীনতার একটি বৈজ্ঞানিক রূপরেখা। বঙ্গবন্ধু জানতেন, ৬ দফা বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় কাঠামোটি ভেঙে পড়বে এবং বাঙালিরা কার্যত একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। ১৯৭০-এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পর তিনি চেয়েছিলেন সেই সাংবিধানিক শক্তি ব্যবহার করে সংসদে ৬ দফা বাস্তবায়ন করতে। এর ফলে পাকিস্তান থেকে আলাদা হওয়ার প্রক্রিয়াটি বিশ্ব দরবারে আইনিভাবে বৈধ হতো এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম কোনো ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আন্দোলন হিসেবে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ত না।

তবে পাকিস্তানি জান্তা যখন আলোচনার টেবিলে ষড়যন্ত্র শুরু করে, তখন ৭ই মার্চের ভাষণই হয়ে ওঠে স্বাধীনতার চূড়ান্ত আগাম বার্তা ও রণকৌশল। এই ঐতিহাসিক ভাষণটি ছিল মূলত স্বাধীনতার এক অলিখিত কিন্তু দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা। তিনি একদিকে আলোচনার পথ খোলা রেখেছিলেন, অন্যদিকে জনগণকে সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁর ভাষণের সেই অমিয় বাণী “আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি” ছিল মূলত এক গেরিলা যুদ্ধের আগাম দিকনির্দেশনা।

তিনি জানতেন তাঁকে যেকোনো সময় বন্দি করা হতে পারে, তাই তিনি আগেই জনতাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন “প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো” এবং “তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকো।” এই নির্দেশের মাধ্যমেই তিনি একটি নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র জনযুদ্ধে রূপান্তর করেন। “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” এই একটি বাক্যের মাধ্যমেই তিনি স্বায়ত্তশাসনের খোলস ভেঙে স্বাধীনতার লক্ষ্যকে জনসমক্ষে পরিষ্কার করে দেন।

বঙ্গবন্ধুর এই অসামান্য কৌশলের কারণেই ১৯৭১ সালে যখন পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা শুরু করে, তখন আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশ কেবল আক্রান্ত রাষ্ট্র নয়, বরং একটি গণতান্ত্রিকভাবে বিজয়ী ও ন্যায়সঙ্গত পক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বঙ্গবন্ধুর সেই “শান্তিপূর্ণ সমাধানের” প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে পাকিস্তান যখন যুদ্ধের পথ বেছে নেয়, তখনই ৭ই মার্চের আগাম দিকনির্দেশনা অনুযায়ী বাঙালি জাতি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে।

লেখক: মো: তামজিদ কামরান 

সাবেক সহ-সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ

আরও নিবন্ধ

সর্বশেষ সংবাদ