সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও রেজিম চেঞ্জ : সার্বভৌমত্বের লড়াইয়ে এক কঠিন বাস্তবতা

অবশ্যই পরুন

বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে যখনই কোনো রাষ্ট্রনায়ক নিজ দেশের জাতীয় স্বার্থকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কথা বলেছেন তখনই তিনি সেই শক্তির প্রধান শত্রুতে পরিণত হয়েছেন। সাম্প্রতিক বিশ্ব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এই অপশক্তিগুলো কোনো দেশপ্রেমিক নেতাকে সহ্য করে না। তাদের লক্ষ্য থাকে একটাই যেকোনো মূল্যে সেই নেতাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া কিংবা পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় করা। এই ষড়যন্ত্রের একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা ছক রয়েছে যা তারা দশকের পর দশক ধরে বিভিন্ন স্বাধীন রাষ্ট্রে প্রয়োগ করে আসছে। যখনই কোনো দেশের শাসক নিজ দেশের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন তখনই তিনি গণতন্ত্রের দোহাই দেওয়া এই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিদের চোখের কাঁটায় পরিণত হন।

ষড়যন্ত্রের নীল নকশা : কালার রেভোল্যুশন ও পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা

সাম্রাজ্যবাদীরা কোনো দেশে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করার আগে সবসময় ভেতর থেকে দেশটিকে পঙ্গু করার কৌশল গ্রহণ করে। তাদের প্রধান হাতিয়ার হলো মার্কিন ডলার যার মাধ্যমে তারা সংশ্লিষ্ট দেশের অভ্যন্তরীণ কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর একটি অংশকে কিনে নেওয়ার চেষ্টা চালায়। এরপর তথাকথিত গণঅভ্যুত্থানের মোড়কে কালার রেভোল্যুশন বা রঙীন বিপ্লব ঘটানো হয়। ডলারে কেনা ভাড়াটে বাহিনীর মাধ্যমে রাজপথে কৃত্রিম অরাজকতা তৈরি করে সাধারণ মানুষের আবেগ ও ক্ষোভকে পুঁজি করা হয় যাতে একটি সুপরিকল্পিত রেজিম চেঞ্জ নিশ্চিত করা যায়।

রেজিম চেঞ্জের পরবর্তী ধাপ হলো সেই দেশে সাম্রাজ্যবাদীদের মনোনীত একটি পুতুল সরকার বসানো। এই পুতুল সরকারের মাধ্যমে তারা ওই দেশের জাতীয় সম্পদগুলোর পূর্ণ দখল নেয়। সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন নেতাকে সরিয়ে দেওয়ার পর শুরু হয় লুটপাটের মহোৎসব। চাপিয়ে দেওয়া হয় আরসা কিংবা আকসার মতো দাসত্বমূলক সামরিক ও বাণিজ্যিক চুক্তি। যেখানে জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এবং পুতুল সরকারগুলো ক্ষমতার লোভে তা মুখ বুজে মেনে নেয়।

ইতিহাসের নিষ্ঠুর সাক্ষ্য : লিবিয়া ইরাক ও সিরিয়া

সাম্রাজ্যবাদী দস্যুতার করুণ উদাহরণ হিসেবে ইতিহাসে টিকে থাকবে লিবিয়া ইরাক এবং সিরিয়া। সাদ্দাম হোসেন কিংবা মুয়াম্মার গাদ্দাফির মতো নেতারা যখন নিজেদের দেশের সম্পদ এবং সার্বভৌমত্ব নিয়ে আপসহীন অবস্থান নিয়েছিলেন তখনই তাদের ওপর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মিথ্যা অজুহাতে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। সাজানো রেভোল্যুশনের নামে এই সমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলোকে আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে সেখানে নিজেদের আজ্ঞাবহ ব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছে। সিরিয়াতেও আমরা দেখেছি কীভাবে ভাড়াটে বাহিনীর মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করা হয়েছে যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ভূরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নেয়া।

ভেনেজুয়েলার সম্পদ লুট ও নগ্ন হস্তক্ষেপ

সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের অন্যতম জঘন্য উদাহরণ হলো ভেনেজুয়েলা। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে রাতের আঁধারে তার বাসভবন থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল এই পরাশক্তি। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলের খনিগুলো নিজেদের কর্তৃত্বে নেওয়া। প্রেসিডেন্টকে অপসারিত করার পর তারা দেশটির জাতীয় সম্পদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং অসম চুক্তির মাধ্যমে অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়। এটি পরিষ্কার করে দেয় যে সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে গণতন্ত্র বা মানবাধিকার কেবল একটি মুখোশ মাত্র যার আড়ালে তারা অন্যের সম্পদ লুণ্ঠন করে।

ইরান পরিস্থিতি : আয়াতুল্লাহ খামেনির শাহাদাত

বর্তমানে ইরানে সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত এবং পাশবিক রূপ উন্মোচিত হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে ডলারে কেনা ভাড়াটে বাহিনী দিয়ে কালার রেভোল্যুশনের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর তারা নগ্ন সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি যিনি আজীবন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক ছিলেন এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় অটল ছিলেন তাকে হত্যার মাধ্যমে তারা এই অঞ্চলের স্বাধীনচেতা কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করতে চাইছে। ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর এই হামলা প্রমাণ করে যে দেশপ্রেমিক নেতাদের সাম্রাজ্যবাদীরা কখনোই শান্তিতে থাকতে দেয় না।

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট : ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ও পুতুল সরকারের উত্থান

এই একই আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত শিকার হয়েছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে যা ঘটেছে তা কোনো সাধারণ গণঅভ্যুত্থান ছিল না বরং তা ছিল সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সরাসরি মদদপুষ্ট একটি নিরেট কালার রেভোল্যুশন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং তাকে সশরীরে শেষ করে দেওয়া। ডলারে কেনা সার্বভৌমত্ব বিরোধী অপশক্তিরা এক ভয়াবহ রক্তপাত ও হত্যার ষড়যন্ত্র প্রায় সফল করে ফেলেছিল।

এই কালার রেভোল্যুশনের মাধ্যমে রেজিম পরিবর্তনের পর বাংলাদেশে বসানো হয়েছে সাম্রাজ্যবাদীদের পুতুল ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুসকে। এই পুতুল সরকার আসার পর থেকেই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে একের পর এক অসম বাণিজ্য চুক্তি করা হচ্ছে। যেখানে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের চেয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত স্বার্থই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং পুতুল সরকার চুপচাপ তা মেনে নিয়েছে। তবে পরিস্থিতি অনুধাবন করে ভারত সময়োচিত হস্তক্ষেপ করায় তারা শেখ হাসিনাকে অন্তত সশরীরে শেষ করতে পারেনি। ভারতের এই সাহসী পদক্ষেপের কারণেই ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু কন্যা রক্ষা পেয়েছেন।

পরিশেষে : বাংলাদেশের রত্ন শেখ হাসিনার জীবন বাঁচানোর জন্য ভারতের এই ঐতিহাসিক ভূমিকার প্রতি জানাই গভীর কৃতজ্ঞতা। দেশপ্রেমিক নেতাদের বিরুদ্ধে এই সুগভীর আন্তর্জাতিক চক্রান্ত এবং পুতুল সরকারের দেশবিরোধী চুক্তিগুলো রুখে দেওয়া আজ প্রতিটি সচেতন নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব।

লেখক : আকিব হোসেন জাবির। 

শিক্ষার্থী আইন বিভাগ, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। 

আরও নিবন্ধ

সর্বশেষ সংবাদ