দেশের অর্থনীতি এখন এক গভীর অচলাবস্থার মুখে দাঁড়িয়ে। ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলায় দেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাত কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে গোলাম মাওলা রনি তাঁর এক ভাইরাল কলামে এই পরিস্থিতিকে অভিহিত করেছেন “অর্থনীতির সর্বনাশ ও দুর্নীতির পৌষ মাস” হিসেবে।
লেখায় তিনি এক শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতির আহাজারির কথা তুলে ধরেন, যিনি অভিযোগ করেছেন যে বর্তমান সময়ে দেশের শিল্পপতিরা বেঁচে থাকার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলেছেন। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, ব্যাংকিং অচলাবস্থা, আমদানি-রপ্তানিতে জটিলতা এবং সরকারি নীতিগত বিশৃঙ্খলা ব্যবসায়িক পরিবেশকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
রনি লিখেছেন, “যেভাবে একসময় বুদ্ধিজীবীদের টার্গেট করে হত্যা করা হয়েছিল, আজ ঠিক সেইভাবে দেশের শিল্পপতিদের আর্থিকভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।”
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এভাবে চলতে থাকলে অনেক ব্যবসায়ী সম্মান রক্ষায় আত্মহননের পথও বেছে নিতে পারেন।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সূচকগুলোও তাঁর বক্তব্যের পক্ষে শক্ত প্রমাণ হাজির করছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) ও বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি এক বছরের ব্যবধানে প্রায় দুই শতাংশ কমে গেছে। একই সময়ে দেশে অন্তত ৩০ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে, আর চলতি অর্থবছরের শেষে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গোলাম মাওলা রনি তাঁর লেখায় আরো উল্লেখ করেন, “যে দেশে জিডিপি কমে যাচ্ছে, সেই দেশে নতুন কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে এটাই আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতা।”
সরকারি হিসেবে গত এক বছরে নতুন কোটিপতি যুক্ত হয়েছে ছয় হাজারের বেশি, অথচ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ বাস্তবতা এক ভয়াবহ ‘অসম অর্থনীতি’র ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে অল্প কয়েকজন দুর্নীতিবাজ প্রভাবশালী গোষ্ঠী রাষ্ট্রের সম্পদ লুটে নিচ্ছে আর সাধারণ মানুষ বেঁচে থাকার লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছে।
অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি দেশে বেড়েছে চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও ঘুষের পরিমাণ। নগদ অর্থের অভাবে গ্রামীণ অর্থনীতি প্রায় ভেঙে পড়ার পথে।
রনির ভাষায়, “চাঁদাবাজরা যখন টাকার ঘাটতিতে পড়ে, তখন তারা হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পর্যন্ত কেড়ে নেয় এটাই আজকের অর্থনৈতিক বাস্তবতা।”
অর্থনীতির এ ভয়াবহ অবস্থায় আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর সহায়তা না মেলায় সরকারও বিপাকে পড়েছে। পুরনো ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে, নতুন ঋণ বা বিনিয়োগ আসছে না।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে বাংলাদেশ ২০২৬ সালের মধ্যে ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার মুখে পড়তে পারে।
গোলাম মাওলা রনির সেই লেখাটি মানুষের হৃদয়ে নাড়া দিয়েছে। কারণ তিনি যে প্রশ্ন তুলেছেন, সেটি এখন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বড় ব্যবসায়ী সবাই অনুভব করছেন:
“আমাদের অর্থনীতির সর্বনাশ হচ্ছে, আর দুর্নীতির পৌষ মাস চলছে।”
