জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে ভারতের সঙ্গে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) পর্যায়ে তেল পরিশোধনের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এ লক্ষ্যে গত ১৬ এপ্রিল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ শুরুর অনুরোধ জানিয়ে একটি জরুরি চিঠি পাঠায়।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, চিঠিটি পররাষ্ট্র সচিবের কাছে পাঠানোর পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়া অনুবিভাগের মহাপরিচালককেও অনুলিপি দেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি ইতোমধ্যে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ভারতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এ উদ্যোগ নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থাটি ‘টোলিং মডেল’-এর ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। এ পদ্ধতিতে বাংলাদেশ নিজস্ব মালিকানাধীন বা অর্থায়নে কেনা অপরিশোধিত তেল ভারতের শোধনাগারে পরিশোধন করাবে। এর বিনিময়ে বাংলাদেশকে পরিশোধন ফি ও পরিবহন ব্যয় বহন করতে হবে।
এ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপিসিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হলে সংস্থাটি কারিগরি ও বাণিজ্যিক বিষয়গুলোতে নেতৃত্ব দেবে।
কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের বর্তমান পরিশোধন সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় এ উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ মূলত ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের ওপর নির্ভরশীল, যার সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত পরিসর তুলনামূলকভাবে সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাতে জ্বালানি তেলের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে।
এ অবস্থায় ভারতের উন্নত ও বড় পরিসরের শোধনাগার অবকাঠামো ব্যবহার করে বাংলাদেশ দ্রুত ও তুলনামূলক কম ব্যয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও বহুমুখী করতে চায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলো বিপিসির সঙ্গে সমন্বয় করে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ ও পরিশোধনের কাজ করবে। পরে পরিশোধিত জ্বালানি বাংলাদেশে সরবরাহ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এ ব্যবস্থার ফলে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটের অস্থিরতা ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক দামে পরিশোধিত জ্বালানি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বিদেশি অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি টোলিং ফি, মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতা এবং বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধন ব্যয় দেশের রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়াতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে এ উদ্যোগ কার্যকর সমাধান হতে পারে। তবে দেশীয় শোধনাগার সম্প্রসারণ ও নিজস্ব পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প হিসেবে নয়, বরং পরিপূরক ব্যবস্থা হিসেবেই এ ধরনের আঞ্চলিক সহযোগিতাকে বিবেচনা করা উচিত।
