শোষণমুক্ত সমাজ ও অর্থনৈতিক মুক্তি: বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস কেবল একটি ভূখণ্ডের রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস নয়; এটি একই সঙ্গে একটি শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার ইতিহাস। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে মুক্তির ডাক দিয়েছিলেন, তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ছিল বহুমাত্রিক। সেই মুক্তি ছিল রাজনৈতিক পরাধীনতার অবসানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক শোষণ, সামাজিক বৈষম্য ও বঞ্চনার অবসানের আকাঙ্ক্ষা। স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে তিনি যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তার কেন্দ্রে ছিল মানুষ বিশেষ করে সেই মানুষ, যাদের শ্রমে অর্থনীতি সচল, অথচ রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পদের ন্যায্য হিস্যা থেকে যারা ঐতিহাসিকভাবে বঞ্চিত।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি স্বাধীনতাকে কখনো নিছক পতাকা, ভূখণ্ড কিংবা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর কাছে স্বাধীনতার প্রকৃত সার্থকতা নিহিত ছিল মানুষের জীবনে। ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে অন্ন, বস্ত্রহীন মানুষের পরনে বস্ত্র, অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা, শিশুর জন্য শিক্ষা, কৃষকের ন্যায্য অধিকার এবং শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবন এসবই ছিল তাঁর অর্থনৈতিক মুক্তির দর্শনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এই উপলব্ধির শিকড় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের একেবারে সূচনালগ্নে প্রোথিত। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে রাজনৈতিক স্বাধীনতার নামে যদি অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শোষণের কাঠামো অক্ষুণ্ন থাকে, তবে সাধারণ মানুষের জীবনে প্রকৃত মুক্তি আসবে না। পূর্ব বাংলার কৃষক, শ্রমিক ও নিম্নবিত্ত মানুষের দুর্দশা, খাদ্য ও বস্ত্রের সংকট, জমিদারি ও মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবস্থার নিপীড়ন এবং শিল্প ও সম্পদের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে তাঁর ধারাবাহিক অবস্থান ছিল সেই উপলব্ধিরই বহিঃপ্রকাশ।
১৯৬৬ সালের ছয় দফা এই অর্থনৈতিক মুক্তির চিন্তার একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক রূপায়ণ। ছয় দফা ছিল কেবল সাংবিধানিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের দাবি নয়; এর গভীরে ছিল পূর্ব বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। অর্থনৈতিক বৈষম্যের অবসান ছাড়া রাজনৈতিক সমতা যে অর্থহীন বঙ্গবন্ধু তা অনেক আগেই উপলব্ধি করেছিলেন। তাই ছয় দফা থেকে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ এই সমগ্র রাজনৈতিক অভিযাত্রার অন্তর্গত স্রোত ছিল মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করা। ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো, বিপর্যস্ত কৃষি ও শিল্প, খাদ্যসংকট, সীমিত বৈদেশিক মুদ্রা, আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতা সবকিছু মিলিয়ে নবজাত রাষ্ট্রটির সামনে ছিল বিরাট প্রতিকূলতা। কিন্তু বঙ্গবন্ধু জানতেন, রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদের মধ্যেও মানুষের আত্মশক্তি সবচেয়ে বড় সম্পদ।
তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রে তাই ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন। উন্নয়ন কেবল জাতীয় আয় বৃদ্ধির পরিসংখ্যান নয়; উন্নয়নের সুফল সমাজের প্রান্তিক মানুষ পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে কি না সেটিই ছিল তাঁর কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, শিল্পের বিকাশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিস্তার এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ন্যায়সংগত ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তিনি এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, যেখানে মানুষের মর্যাদা হবে উন্নয়নের প্রধান সূচক।
শোষণমুক্ত সমাজের ধারণাটিও বঙ্গবন্ধুর কাছে ছিল বাস্তবমুখী ও মানবকেন্দ্রিক। তিনি এমন একটি সমাজ কল্পনা করেছিলেন যেখানে মানুষের পরিচয় তার সম্পদ, বংশ বা সামাজিক অবস্থান দিয়ে নির্ধারিত হবে না; বরং প্রত্যেক নাগরিক রাষ্ট্রের সমান মর্যাদার অধিকারী হবে। কৃষক ও শ্রমিকের শ্রমকে অবজ্ঞা করে কোনো উন্নত রাষ্ট্র গড়ে উঠতে পারে না এই সত্য তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। ফলে তাঁর অর্থনৈতিক দর্শনে কৃষি ও শিল্প ছিল পরস্পরবিরোধী নয়; বরং পরস্পরের পরিপূরক।
স্বাধীনতার প্রথম পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় খাতকে প্রাধান্য দেওয়ার পেছনেও ছিল বাস্তবতার নির্মোহ বিবেচনা। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে ব্যক্তিখাতের শক্তিশালী ভিত্তি, পর্যাপ্ত পুঁজি কিংবা উদ্যোক্তা-শ্রেণি কার্যত অনুপস্থিত ছিল। তাই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের মাধ্যমে শিল্প ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠন করা ছিল সময়ের প্রয়োজন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক চিন্তাকে কেবল রাষ্ট্রীয় মালিকানার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে তাঁর সামগ্রিক দর্শনকে খণ্ডিত করা হয়। তিনি উদ্যোক্তা সৃষ্টি, ব্যক্তিখাতের বিকাশ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তাও উপলব্ধি করেছিলেন। অর্থাৎ তাঁর লক্ষ্য ছিল কোনো একক অর্থনৈতিক মতবাদের অনুগামী হওয়া নয়; বরং বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নির্মাণ করা, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য মানুষের কল্যাণ।
বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক মুক্তির দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল রাষ্ট্রের অর্থনীতি মানুষের জন্য, মানুষ অর্থনীতির জন্য নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের জীবনমান উন্নত করে; শিল্পায়ন তখনই সার্থক, যখন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে; কৃষির আধুনিকায়ন তখনই সফল, যখন কৃষকের জীবন নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ হয়; আর রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন তখনই টেকসই, যখন তার সুফল সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছে।
এই দর্শনের আলোতেই শোষণমুক্ত সমাজের ধারণাকে আজ নতুন করে অনুধাবন করা প্রয়োজন। বর্তমান বিশ্বে শোষণের রূপ পরিবর্তিত হয়েছে। একসময় শোষণ ছিল জমিদারি, ঔপনিবেশিক বৈষম্য কিংবা কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের দৃশ্যমান কাঠামোতে। আজ তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আয় ও সম্পদের বৈষম্য, সুযোগের অসমতা, কর্মসংস্থানের সংকট, প্রযুক্তিগত বৈষম্য, আর্থিক অনিয়ম এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। ফলে বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক মুক্তির দর্শন আজও প্রাসঙ্গিক বরং নতুন বাস্তবতায় এর প্রয়োজন আরও গভীর।
একটি শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য তাই শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ন্যায্য সুযোগের রাষ্ট্র নির্মাণ। যেখানে একজন কৃষকের সন্তানও মানসম্মত শিক্ষা পাবে, একজন শ্রমিকের সন্তানও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে, তরুণ প্রজন্ম কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ পাবে এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিক তার মেধা ও শ্রমের যথাযথ মূল্য পাবে। সামাজিক নিরাপত্তা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির গণতন্ত্রীকরণ এবং ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান এসবই অর্থনৈতিক মুক্তির আধুনিক উপাদান।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ তাই কোনো অতীতমুখী রাজনৈতিক কল্পনা নয়; এটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি নৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শন। সেই দর্শনের মূল কথা অত্যন্ত সরল রাষ্ট্রের অগ্রগতির চূড়ান্ত মাপকাঠি হবে মানুষের অগ্রগতি। একটি দেশের সেতু, সড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা কিংবা জিডিপির প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই উন্নয়ন মানুষের জীবনে কতটা নিরাপত্তা, মর্যাদা, সুযোগ ও স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছে।
আজকের বাংলাদেশকে যদি সত্যিকার অর্থে শোষণমুক্ত ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, তবে বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক মুক্তির দর্শনকে কেবল স্মৃতিচারণের বিষয় হিসেবে রাখলে চলবে না; তাকে নীতি, প্রতিষ্ঠান ও কর্মপরিকল্পনার মধ্যে প্রতিফলিত করতে হবে। কৃষককে উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য, শ্রমিককে মর্যাদা ও নিরাপত্তা, তরুণকে দক্ষতা ও কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তাকে সুযোগ, দরিদ্রকে সামাজিক সুরক্ষা এবং প্রতিটি নাগরিককে সমান মর্যাদা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই সেই দর্শনের বাস্তবায়ন সম্ভব।
বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্নের বীজ বপন করেছিলেন, তার মূল মন্ত্র ছিল মানুষের মুক্তি। রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছিল সেই যাত্রার প্রথম অধ্যায়; অর্থনৈতিক মুক্তি ছিল তার অপরিহার্য পরিণতি। আর শোষণমুক্ত সমাজ ছিল সেই মুক্তির সর্বোচ্চ নৈতিক অভীষ্ট।
সুতরাং বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ মানে কেবল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নয় এটি এমন এক রাষ্ট্রের প্রত্যয়, যেখানে উন্নয়ন হবে মানুষের জন্য, অর্থনীতি হবে ন্যায়ের ভিত্তিতে পরিচালিত, রাষ্ট্র হবে নাগরিকের মর্যাদার রক্ষক এবং সমাজ হবে বৈষম্য ও শোষণের ঊর্ধ্বে ওঠার অবিরাম প্রয়াসের প্রতীক।
বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন তাই ইতিহাসের পৃষ্ঠায় স্থির কোনো অধ্যায় নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের এক চলমান অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকারের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার অর্থই হলো একটি মানবিক, বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত ও মর্যাদাশীল বাংলাদেশ নির্মাণের সংগ্রামকে অব্যাহত রাখা।
- দেলোয়ার শাহজাদা, উপ-দপ্তর সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ।
