২১ আগস্ট: রক্তাক্ত স্মৃতি, বিচারিক পরিণতি ও ইতিহাসের দায়: মোহাম্মদ হাসান

অবশ্যই পরুন

আজ ২১ আগস্ট। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গভীর বেদনাবিধুর দিন। ২০০৪ সালের এই দিনে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে প্রধান অতিথি করে আয়োজিত আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। মুহূর্তের মধ্যে একটি রাজনৈতিক সমাবেশ পরিণত হয় রক্তাক্ত প্রান্তরে। আওয়ামী লীগের তৎকালীন মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন এবং আহত হন শত শত মানুষ। শেখ হাসিনাও গুরুতর বিপদের মুখে পড়েছিলেন।

দুই দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। সময় বদলেছে, সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে, রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামোতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। কিন্তু ২১ আগস্টের সেই রক্তাক্ত বিকেল বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি। বরং সময় যত গড়িয়েছে, ঘটনাটি তত বেশি করে সামনে এনেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—রাজনৈতিক সহিংসতার মতো ভয়াবহ অপরাধের বিচার কীভাবে হবে, এবং সেই বিচার কতটা নিরপেক্ষ, আইনসম্মত ও প্রমাণনির্ভর হবে?

এই প্রশ্নের গুরুত্ব আরও বেড়েছে সাম্প্রতিক বিচারিক পরিণতির কারণে।

২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ ২১ আগস্টের হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের মামলায় রায় ঘোষণা করে। ওই রায়ে ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং আরও ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে মামলাটির বিচারিক ভিত্তি নিয়ে উচ্চ আদালতে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট সম্পূরক অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে পরিচালিত নিম্ন আদালতের বিচারপ্রক্রিয়াকে অবৈধ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডের ডেথ রেফারেন্স নাকচ এবং আসামিদের আপিল মঞ্জুর করে সবাইকে খালাস দেওয়া হয়।

এরপর রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যায়। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ করে হাইকোর্টের খালাসের রায় বহাল রাখে। আদালত কিছু পর্যবেক্ষণ, সংশোধন ও প্রত্যাহারের নির্দেশনাসহ রায় দেয়।

অর্থাৎ আইনের বিচারে আজকের বাস্তবতা হলো—২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলায় পূর্বে দণ্ডিত সব আসামিই শেষ পর্যন্ত খালাস পেয়েছেন।

এই জায়গাটিই আমাদের সবচেয়ে বেশি ভাবায়।

একদিকে ২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাগুলোর একটি। অন্যদিকে, কোনো নাগরিককে কেবল রাজনৈতিক পরিচয়, জনমত বা সন্দেহের ভিত্তিতে অপরাধী সাব্যস্ত করাও আইনের শাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অপরাধ যত ভয়াবহই হোক, বিচার হতে হবে সাক্ষ্য, প্রমাণ, আইনি প্রক্রিয়া এবং ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠিত নীতির ভিত্তিতে।

এখানেই ইতিহাস ও আইনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য প্রয়োজন।

২১ আগস্টের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং আদালতের রায়কে সম্মান করা—এই দুটি বিষয় পরস্পরবিরোধী নয়।

শহীদদের হত্যার দায় নির্ধারণ করতে হবে নির্ভরযোগ্য তদন্ত ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে। আর কোনো নিরপরাধ মানুষকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা দুর্বল তদন্তের কারণে শাস্তি দেওয়া যাবে না। একইভাবে, কোনো ভয়াবহ অপরাধের প্রকৃত অপরাধীরা যদি প্রমাণের দুর্বলতা বা তদন্তের ত্রুটির কারণে বিচারের বাইরে থেকে যায়, সেটিও রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য সমানভাবে উদ্বেগের বিষয়।

২১ আগস্টের মামলার বিচারিক ইতিহাস আমাদের এই কঠিন শিক্ষা দেয় যে, ন্যায়বিচারের জন্য শুধু মামলা দায়ের করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, সংরক্ষিত আলামত, নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এবং আইনের নির্ভুল প্রয়োগ।

কারণ বিচার যদি প্রমাণের পরিবর্তে রাজনৈতিক আবেগের ওপর দাঁড়ায়, তাহলে একসময় সেই বিচারই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই শিক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল, প্রতিশোধের অভিযোগ, মামলা, গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক হয়রানি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এক সময় যারা রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে ছিলেন, তারা বিচার ও ন্যায়বিচারের দাবি করেছেন; আবার ক্ষমতার পরিবর্তনের পর তাদের বিরুদ্ধেই একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে।

এই চক্র থেকে বাংলাদেশকে বেরিয়ে আসতে হবে।

কারণ রাষ্ট্র কোনো দলের নয়; রাষ্ট্র জনগণের। আদালত কোনো রাজনৈতিক পক্ষের নয়; আদালত ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠান। তদন্ত সংস্থা কোনো সরকারের হাতিয়ার নয়; তাদের দায়িত্ব সত্য উদ্ঘাটন করা।

২১ আগস্টের স্মৃতি তাই কেবল অতীতের একটি শোকাবহ ঘটনা স্মরণ করার দিন নয়। এটি রাষ্ট্রের কাছে একটি প্রশ্নও ছুড়ে দেয়—আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পেরেছি, যেখানে রাজনৈতিক মতভেদ কখনো হত্যার কারণ হবে না? যেখানে বিরোধী দলের সমাবেশে হামলা হবে না? যেখানে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে বিচারব্যবস্থার চরিত্র পাল্টাবে না? যেখানে কোনো অপরাধী রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে রক্ষা পাবে না, আবার কোনো নিরপরাধ মানুষ রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শাস্তিও পাবে না?

আজ ২১ আগস্টে আইভি রহমানসহ নিহত ২৪ জনের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো মানে শুধু ফুল দেওয়া কিংবা আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া নয়। তাঁদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে হত্যা, সন্ত্রাস, প্রতিহিংসা ও সহিংসতার কোনো স্থান থাকবে না।

যারা আহত হয়েছিলেন, তাঁদের কষ্টও আমাদের স্মরণ করতে হবে। তাঁদের শরীরে বহন করা ক্ষত বাংলাদেশের রাজনীতির এক অন্ধকার অধ্যায়ের সাক্ষ্য বহন করে। রাজনৈতিক কর্মী হওয়া কোনো অপরাধ নয়। মতাদর্শ ভিন্ন হওয়া কোনো অপরাধ নয়। তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্যের জবাব হতে পারে যুক্তি, ভোট ও গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা—গ্রেনেড নয়।

একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, বিচার বিভাগের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক স্লোগানের মাধ্যমে বাতিল করা যায় না। আদালত যে সিদ্ধান্ত দিয়েছে, সেটি আইনের কাঠামোর মধ্যেই মূল্যায়ন করতে হবে। আদালতের রায় পছন্দ না হলে সাংবিধানিক ও আইনগত পথেই তার সমালোচনা ও পর্যালোচনা হতে পারে। কিন্তু বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা ধ্বংস করে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না।

২১ আগস্টের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই।

সত্যকে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ব্যবহার করা যাবে না, আবার সত্য অনুসন্ধানের নামে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকেও বৈধতা দেওয়া যাবে না।

ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা মানে নিজের পছন্দের ব্যাখ্যাকে ইতিহাস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা নয়। বরং ইতিহাসের প্রতিটি অন্ধকার অধ্যায়কে তথ্য, দলিল, সাক্ষ্য ও প্রমাণের আলোকে পুনর্বিবেচনা করা। কারণ ইতিহাসের বিচার আদালতের বিচার থেকে আলাদা হলেও দুটির ভিত্তি একই—সত্য।

আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে ন্যায়বিচারের সংজ্ঞা পরিবর্তিত হবে না। যে অপরাধ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অপরাধ ছিল, তা বিএনপি বা অন্য কোনো সরকারের সময়ও অপরাধ থাকবে। যে অধিকার আওয়ামী লীগের কর্মীর জন্য প্রযোজ্য, একই অধিকার বিএনপির কর্মী, জাতীয় পার্টির কর্মী, জামায়াতের কর্মী কিংবা কোনো রাজনৈতিক পরিচয়হীন সাধারণ নাগরিকের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য হতে হবে।

কারণ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য সংখ্যাগরিষ্ঠের ক্ষমতায় নয়; সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষায়।

২১ আগস্টের বেদনা আমাদের সেই গণতন্ত্রের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

আজ যারা নিহত হয়েছেন তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। আহতদের প্রতি সহমর্মিতা। তাঁদের পরিবার ও স্বজনদের প্রতি সমবেদনা।

কিন্তু একই সঙ্গে আজকের দিনে আমাদের শপথ হওয়া উচিত—বাংলাদেশের রাজনীতিতে আর কোনো ২১ আগস্ট নয়; আর কোনো রাজনৈতিক সমাবেশে গ্রেনেড নয়; আর কোনো মতপার্থক্যের জবাবে হত্যা নয়।

ন্যায়বিচার হোক প্রমাণের ভিত্তিতে, রাজনীতি হোক যুক্তির ভিত্তিতে, ক্ষমতার ব্যবহার হোক সংবিধানের সীমার মধ্যে এবং রাষ্ট্র হোক সব নাগরিকের।

২১ আগস্টের রক্তাক্ত ইতিহাস আমাদের প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, সত্য ও ন্যায়বিচারের রাজনীতি শেখাক। শহীদদের স্মৃতি আমাদের বিভাজন নয়, এমন একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণের প্রেরণা দিক—যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, আইনের শাসনই হবে সবার শেষ আশ্রয়।

লেখক: মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

আরও নিবন্ধ

সর্বশেষ সংবাদ