এনসিটিতে কেন বিদেশি শকুনের চোখ?

অবশ্যই পরুন

চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি রাষ্ট্রের অন্যতম স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। এই বন্দর প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে কোষাগারে রাজস্ব যোগায়। বিগত ১৫ বছরে গড়ে ১০% হারে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, আর পুরো সাফল্য এসেছে দেশীয় অপারেটর ও শ্রমিকদের দক্ষতা, অধ্যবসায় ও অভিজ্ঞতা থেকে।

তবুও প্রশ্ন জাগে এই সফল প্রতিষ্ঠানকে কেন বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার তোড়জোড় চলছে?

চট্টগ্রাম বন্দরের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব:

চট্টগ্রাম বন্দরকে বলা হয় দক্ষিণ এশিয়ার প্রবেশদ্বার। মানচিত্রে দেখলে বোঝা যায় এক পাশে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড, অন্য পাশে ভারতের সেভেন সিস্টার অঞ্চল, আর অদূরে নেপাল, ভুটান ও চীন। অর্থাৎ, এই বন্দরটি এমন এক স্থানে অবস্থিত যা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্য এবং কৌশলগত যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু।

যে রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান এই বন্দরের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ পাবে, সে-ই পুরো অঞ্চলের বাণিজ্যিক রুট ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে।

বৈশ্বিক কৌশল: “অপারেশনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ”

বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশের বন্দর সরাসরি দখল করা সম্ভব নয়। তাই পরাশক্তিগুলো এখন বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব ও অপারেশন চুক্তির মাধ্যমে প্রবেশ করছে।বাংলাদেশ সরকার যখন বন্দর পরিচালনায় বেসরকারি অপারেটর ব্যবস্থাপনা চালু করল, তখনই বিদেশি স্বার্থগোষ্ঠী সুযোগটি দেখল।

তাদের মূল লক্ষ্য NCT (New Mooring Container Terminal)।
এই টার্মিনাল একাই বন্দরের প্রায় ৪৪% কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে, যেখানে একসাথে চারটি বড় জাহাজ ভিড়তে পারে। এটি পুরোপুরি দেশের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত একটি আধুনিক জেটি অর্থাৎ জাতীয় গর্বের প্রতীক।

দেশীয় অপারেটর বনাম বিদেশি স্বার্থ

দেশীয় অপারেটররা এতদিন সফলভাবে এনসিটি পরিচালনা করেছে। কিন্তু এখন দুবাই-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান DP World এর হাতে এই টার্মিনালের দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

DP World নামটি শুধু দুবাই সরকারের নয়, এর পেছনে রয়েছে আমেরিকার কৌশলগত সমর্থন।
কারণ, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র চট্টগ্রাম বন্দরকে ভূরাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখে। এই বাস্তবতায়, “বাণিজ্যিক চুক্তি”র আড়ালে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা অমূলক নয়।

অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও প্রভাবিতকরণ

বিদেশি অপারেটরকে প্রবেশের পথ মসৃণ করতে নানা অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বন্দরের এলাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে,

প্রতিবাদী কর্মচারীদের চিহ্নিত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ এসেছে, কর্মচারীদের মন শান্ত রাখতে ১ লক্ষ টাকা প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, সেই প্রণোদনার খবর সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ না করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ফলে কর্মচারীরা আপাতত স্বস্তিতে থাকলেও, দীর্ঘমেয়াদে তাঁরা হারাচ্ছেন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের অধিকার।

শেষ কথা

চট্টগ্রাম বন্দর শুধুই একটি বাণিজ্যকেন্দ্র নয় এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রতীক,
জাতীয় সক্ষমতার প্রতিফলন,
এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের চাবিকাঠি।

আজ প্রশ্ন কেবল একটি টার্মিনালকে কেন্দ্র করে নয়! প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি নিজেদের অর্জন ও ভবিষ্যৎ বিদেশিদের হাতে তুলে দেব,
নাকি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে নিজেদের সম্পদ নিজেরাই রক্ষা করব?

লিখেছেন: অর্থনীতিবিদ জয়নাল আবেদীন

আরও নিবন্ধ

সর্বশেষ সংবাদ