যারা আজো মুখে ফেনা তুলে বলে বেড়ায় “জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১ সালের গণহত্যায় সরাসরি জড়িত ছিল না”, তাদের জন্য ইতিহাসের আয়না একবার খুলে দেখা জরুরি।
অপারেশন সার্চলাইটের পর যখন পূর্ববাংলা আগুনে পুড়ছে, পাকিস্তানি সেনারা নারী ধর্ষণ করছে, শিশু হত্যা করছে, গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে তখন কারা তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল?
কারা তাদের সহযোগী সংগঠন গড়ে দিয়েছিল?
শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর ও আল শামস; এই সব মানবতাবিরোধী বাহিনী গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের।
তারা সরাসরি পাকিস্তানি সেনাদের তথ্য, দিকনির্দেশনা ও স্থানীয় সহায়তা দিয়েছে; মুক্তিকামী বাঙালিদের ধরিয়ে দিয়েছে, হত্যা ও নির্যাতনে অংশ নিয়েছে। অর্থাৎ, যুদ্ধের শুরু থেকেই জামায়াত ছিল শত্রুর কাতারে।
এরপর আসে ৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭১, কালো ইতিহাসের আরেক অধ্যায়।
সেদিন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানে একটি পুতুল সরকার গঠন করে, যার নাম মালেক মন্ত্রিসভা।
এই সরকারের দুই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী কারা ছিলেন জানেন?
আব্বাস আলী খান শিক্ষামন্ত্রী (জামায়াত)
এ.কে.এম ইউসুফ রাজস্বমন্ত্রী (জামায়াত)
অর্থাৎ, যখন পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যায় মেতে আছে, তখন জামায়াতের শীর্ষ নেতারা মন্ত্রিত্বের চেয়ার গায়ে চাপিয়ে সেই হত্যাযজ্ঞকে বৈধতা দিচ্ছিল।
এই সরকারের প্রধান ছিলেন আব্দুল মোত্তালেব মালেক আর প্রশাসনিক ক্ষমতা ভাগ হয়েছিল আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজীর সাথে, যিনি সরাসরি গণহত্যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
এখন বলো যে সরকার মানবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছিল, সেই সরকারের মন্ত্রী হয়ে কাজ করা কি যুদ্ধাপরাধে সহযোগিতা নয়?
এটা “সরাসরি অংশগ্রহণ” না হলে আর কী?
আব্বাস আলী খান আর এ.কে.এম ইউসুফ তখন জামায়াতে ইসলামী পূর্ব পাকিস্তানের নায়েবে আমির।
অর্থাৎ তারা শুধু ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং জামায়াতে ইসলামীর আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব করছিলেন।
তাই মালেক মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়ে তারা শুধু নিজেদের নয়, পুরো জামায়াতকেই আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানি সেনাদের পক্ষে দাঁড় করিয়েছিল।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমান জামায়াতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে আব্বাস আলী খান জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির হয় এবং পরবর্তীতে দু’দফায় ভারপ্রাপ্ত আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। অন্যদিকে এ.কে.এম ইউসুফ জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের মহাসচিব (সেক্রেটারি জেনারেল) হয়, পরে টানা তিন মেয়াদে একই পদে থেকে পরবর্তীতে সিনিয়র নায়েবে আমির হয় এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই পদেই ছিল।
তাই স্পষ্ট, ২৫শে মার্চ ১৯৭১ থেকেই জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের গণহত্যার অংশীদার এবং যুদ্ধাপরাধের দায় দল হিসেবে তাদের ঘাড়ে চিরকাল থাকবে।
“জামায়াত মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ছিল না”
এই কথা ইতিহাসের সাথে এক ভয়াবহ প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়।
প্রশ্ন একটাই
যে দল আমার দেশের জন্মের বিরোধিতা করেছে,
যে দল আমার মাটিতে রক্ত ঝরিয়েছে,
যে দল স্বাধীনতার শত্রুদের হাতিয়ার হয়েছে
সেই দল আজো কীভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতি করে?
যে আমার জন্মের বিপক্ষে ছিল, সে আমাকে শাসন করার অধিকার রাখে না।
জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতক, যুদ্ধাপরাধীদের সহযোগী ও মানবতার শত্রু চিরকাল।
লিখেছেন: একজন রাজনৈতিক কর্মী
