বদলে নিতে পারতাম পাসপোর্ট, পরিচয়, এমনকি ভবিষ্যৎও। কিন্তু করিনি। কারণ বিশ্বাস করতাম, শিকড় ছিঁড়ে ফেললে নিজেকেই হারিয়ে ফেলি।
২০০৬ সালে আমি সিঙ্গাপুরের Permanent resident status পাই। এরপর থেকে আমি আরও ৬ টি দেশের permanent resident status পাই। ২০১১ সালের পাসপোর্ট নেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু আমি নিইনি কারণ সেটা নিতে গেলে আমাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হতো। আমি আমার শিকড় ছাড়তে প্রস্তুত ছিলাম না।
আমার কাছের অনেক মানুষই জানেন আমার বাবা-মা ১৯৯১ সাল থেকে dual citizen, কিন্তু আমি কোনদিন এক মুহূর্তের জন্যও অন্য দেশের পাসপোর্ট নেওয়ার কথা ভাবিনি। আমার ব্যবসার সুবিধার্থে বিভিন্ন দেশের Permanent resident status ই (ভিসা ফ্রি ট্রাভেল) যথেষ্ট ছিল। আমার হৃদয় সবসময় বাংলাদেশেই ছিল।
কিন্তু এখন?
শুধু গত এক বছরে আমি ১১টি দেশ সফর করেছি। আর প্রতিবার ইমিগ্রেশনে আমি সেটা অনুভব করেছি। তাদের চোখে সন্দেহ। শেষ নেই প্রশ্নের। যেন বাংলাদেশি পাসপোর্ট মানেই হুমকি, বোঝা, কিংবা ঝুঁকি।
গতকাল লন্ডনে, এক কিশোর বিক্রেতা আমাকে সিমকার্ড বিক্রি করতে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনাদের দেশে কি এখন গৃহযুদ্ধ চলছে?” ওর কথায় কোনও রসিকতা ছিল না। পৃথিবীর চোখে আমরা আজ এই জায়গায় নেমে গেছি।
আমি দেখেছি কিভাবে ইমিগ্রেশন অফিসাররা আমাদের মানুষকে অপমান করছে। আমি নিজে অনুভব করেছি সেই লজ্জা একটা পাসপোর্ট হাতে নেওয়ার যেটা এখন আর সম্মান বহন করে না। এটা বড্ড কষ্টের। কারণ এখন আমাদের দেশের নাম আফগানিস্তান, গাজা, সিরিয়া এইসব যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পাশে উচ্চারিত হচ্ছে। আর এখন… বাংলাদেশ?
বিশ্বের ৭০টির বেশি দেশ এখন বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়া নিয়ে ভাবছে, দেরি করছে, কিংবা সোজাসুজি না করে দিচ্ছে। এমনকি শ্রীলঙ্কার মতো দেশও বাংলাদেশীদের এন্ট্রি বন্ধ করে দিয়েছে, যে দেশে জীবনও ভিসা লাগিনি। এই মাসে ১০৬ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিক থেকে ১০০ তম।
আমার হাতে বিকল্প আছে। আমিতো আজই পাসপোর্ট বদলাতে পারি। কিন্তু আগামী প্রজন্মের কী হবে? তারাতো বিদেশে পড়তেও যেতে পারবে না। আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি জনশক্তি রপ্তানি, সেটাও যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলেতো বাংলাদেশের মানুষ না খেয়ে মরবে ।
এটা শুধু একজন মানুষের নয় এটা একটি জাতির চেতনার প্রশ্ন।বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কে গড়ে দেবে, সেই প্রশ্নে আর বসে থাকার সময় নেই। আর যারা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে, তাদেরকেউ আর ছাড় দিয়া যাবে না।
আমাদেরই বদল আনতে হবে। আমাদেরই ইতিহাস লিখতে হবে। কারণ জাতির ভাবমূর্তি কোনো দয়া নয় এটা অধিকার। এবং এই অধিকার ছিনিয়ে আনতে, আমাদেরই নেতৃত্ব নিতে হবে। কেউ এসে করে দেবে না আমাদেরই হতে হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের নির্মাতা। কিছু বিদেশি দালাল, জঙ্গি, চোর, বাটপারদের আর চাটুকারদের জন্য কেন ১৮ কোটি সহজ সরল বাংলাদেশী ভুক্তভোগী হবে ?
লিখেছেন: তানভীর এ মিশুক
প্রাক্তন প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, নগদ
