পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইতিহাসে সবচেয়ে গভীর বিতর্কের একটি দিক হলো তাদের সামরিক অভিযানে সবচেয়ে বেশি প্রাণ গেছে মুসলিম জনগোষ্ঠীরই। ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযানে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ আন্তর্জাতিকভাবে নথিভুক্ত হয়। এরপর ১৯৭৭ সালের জিয়াউল হকের সামরিক শাসন, বেলুচিস্তানে ধারাবাহিক অভিযান, কাশ্মীরে আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ এবং সোয়াত ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় সামরিক অভিযানে বহু বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইতিহাসে সেনাবাহিনীর ভূমিকা শুধু সীমান্তরক্ষা বা যুদ্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সংঘাতেও সামরিক বাহিনী বারবার কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই দীর্ঘ ইতিহাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বেসামরিক মানুষ হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, গুম, বেআইনি আটক ও নির্বিচার হামলার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, পরবর্তী সময়ে বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়া এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফগানিস্তানে এসব অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে।
১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং রক্তাক্ত অধ্যায়গুলোর একটি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ২৫ মার্চ ১৯৭১ থেকে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। Human Rights Watch-এর ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের হাতে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, ধর্ষণ এবং গ্রাম-শহর ধ্বংসের কথা নথিভুক্ত হয়েছে। নিহতের সংখ্যার বাংলাদেশের সরকারি ও বহু ঐতিহাসিক সূত্রে প্রায় ৩০ লাখ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নথিতে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে।
১৯৭১-এর পর পাকিস্তানের সামরিক রাজনীতির আরেকটি বড় অধ্যায় শুরু হয় ১৯৭৭ সালে। ৫ জুলাই জেনারেল জিয়াউল হক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। এরপর রাজনৈতিক বিরোধীদের গ্রেপ্তার, সামরিক আদালত, নির্যাতন এবং মৃত্যুদণ্ড পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ এই পর্যায়ে সেনাবাহিনীর সহিংসতা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, পাকিস্তানের নিজস্ব নাগরিকদের বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হয়েছে।
এরপর বেলুচিস্তান দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হয়। বেলুচ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমনে পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযানে বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, গুম, আটক এবং নির্যাতনের অভিযোগ বহু বছর ধরে উঠে আসছে। Human Rights Watch-এর নথিতে বেলুচিস্তানে সামরিক অভিযানের পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও বেলুচ অধিকারকর্মীরা হাজার হাজার নিখোঁজ ব্যক্তির অভিযোগ করে আসছেন। Amnesty International-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে পাকিস্তানে জোরপূর্বক গুমকে এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; সরকারি কমিশন ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে ১২৫টি নতুন গুমের মামলা নথিভুক্ত করেছিল, যদিও নাগরিক সমাজের হিসাব আরও বেশি।
খাইবার পাখতুনখোয়া ও সোয়াতেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র তালেবান গোষ্ঠীগুলোর দীর্ঘ সংঘাত হয়েছে। তালেবান ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠী আত্মঘাতী হামলা, হত্যা ও অন্যান্য গুরুতর অপরাধ করেছে এটি সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। একই সময়ে পাকিস্তানি সামরিক অভিযানের সময় বেসামরিক হতাহত, নির্বিচার আটক এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগও মানবাধিকার সংস্থাগুলো নথিভুক্ত করেছে। ফলে এই সংঘাতকে কেবল “সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান” হিসেবে দেখলে বেসামরিক মানুষের ওপর পড়া মানবিক মূল্যটি সম্পূর্ণভাবে বোঝা যায় না।
পাকিস্তানি সামরিক শক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র কাশ্মীর। আজাদ কাশ্মীরের রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার পরিস্থিতি নিয়ে Human Rights Watch অতীতে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বেআইনি আটক, নির্যাতন এবং গোপন আটককেন্দ্র ব্যবহারের অভিযোগ নথিভুক্ত করেছে। এখানে নিহতের নির্ভরযোগ্য সামগ্রিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন; কিন্তু আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডের সর্বশেষ আন্তর্জাতিকভাবে নথিভুক্ত অধ্যায় আফগানিস্তান। ২০২৫ সালের শেষদিকে এবং ২০২৬ সালে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সীমান্ত সংঘাত তীব্র হলে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী আফগান ভূখণ্ডে বিমান হামলা চালায়। জাতিসংঘের আফগানিস্তান মিশন UNAMA জানায়, ২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সীমান্ত সংঘাতে আফগানিস্তানে অন্তত ৭০ জন বেসামরিক নিহত ও ৪৭৮ জন আহত হন। ২০২৫ সালের ১০–১৭ অক্টোবরের সংঘাতে একাই ৪৭ জন নিহত এবং ৪৫৬ জন আহত হয়েছিলেন।
২০২৬ সালের ২১–২২ ফেব্রুয়ারির পাকিস্তানি বিমান হামলায় আফগানিস্তানের নানগারহার প্রদেশে অন্তত ১৩ জন বেসামরিক নিহত ও সাতজন আহত হওয়ার প্রাথমিক তথ্য দেয় UNAMA; নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল। (UNAMA) এরপর ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ মার্চ পর্যন্ত জাতিসংঘ ১৮৫ জন আফগান বেসামরিক হতাহত যাচাই করে—৫৬ জন নিহত এবং ১২৯ জন আহত। এই হতাহতদের ৫৫ শতাংশ ছিল নারী ও শিশু।
২৮ জুন ২০২৬ এ পাকিস্তানি বাহিনীর বিমান হামলায় আফগানিস্তানের পাকতিয়া, পাকতিকা ও কুনার প্রদেশে অন্তত ২৮ জন বেসামরিক নিহত এবং ৪৯ জন আহত হওয়ার কথা UNAMA জানায়। নিহত ও আহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল। পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় ওই তিন প্রদেশে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল। (UNAMA) Human Rights Watch-ও পরে এই হামলায় বেসামরিক হতাহতের কথা উল্লেখ করে এবং সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে।
এই দীর্ঘ ইতিহাসের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট: পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ কোনো একটি অঞ্চল বা একটি সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৭১ সালের পূর্ব পাকিস্তান থেকে বেলুচিস্তান, কাশ্মীর, সোয়াত ও খাইবার পাখতুনখোয়া হয়ে সাম্প্রতিক আফগানিস্তান পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, নির্যাতন, গুম ও বাস্তুচ্যুতির অভিযোগ সামনে এসেছে।
