পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে বান্দরবানের বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধস ও রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সারা দেশের সঙ্গে বান্দরবানের সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে গাছ ও খুঁটি ভেঙে পড়ায় পুরো জেলা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবা বিঘ্নিত হওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, ভেঙে পড়েছে বেইলি ব্রিজ
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত শুক্রবার নিম্নাঞ্চলের পানি কিছুটা কমলেও রাতে নতুন করে ভারী বর্ষণ শুরু হলে পরিস্থিতি আরও শোচনীয় রূপ নেয়। শনিবার সকালে বান্দরবান-রাঙ্গামাটি সড়কের বাঙ্গালহালিয়ার ব্রিজঘাট এলাকার একটি বেইলি ব্রিজ পানির তীব্র স্রোতে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। বান্দরবান সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন জানান, দুধপুকুরিয়া এলাকার রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। সড়ক সচল করতে সওজ-এর টিম প্রস্তুত থাকলেও বালাঘাটা ও স্বর্ণমন্দির এলাকায় সড়ক ডুবে থাকায় তারা দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারছেন না।
বর্তমানে জেলা শহরের সঙ্গে রাঙ্গামাটি, বাঙ্গালহালিয়া-চন্দ্রঘোনা সড়ক এবং রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি উপজেলার সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এছাড়া সাতকানিয়ার বাজালিয়া এলাকায় সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারগামী দূরপাল্লার বাস চলাচলও বন্ধ রয়েছে। মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পায়ে হেঁটে যাতায়াত করছেন।
অন্ধকার ও নেটওয়ার্কহীনতায় চরম ভোগান্তি
শনিবার সকাল থেকে গাছ ভেঙে পড়ায় পুরো জেলা শহর বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। বিকেল পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা সম্ভব হয়নি। শহরের অধিকাংশ জায়গায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবা না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয়রা। রোয়াংছড়ি সদর ইউপি চেয়ারম্যান মেহ্লাঅং মারমা জানান, ফোন নেটওয়ার্ক না থাকায় তিনি বাধ্য হয়ে নিজে গিয়ে দুর্গতদের খোঁজ নিচ্ছেন। রুমা, থানচি, লামা ও আলীকদমেও একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
প্লাবিত জেলা শহর ও ক্ষয়ক্ষতি
শহরের ফায়ার সার্ভিস, বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের রেস্ট হাউস, সেনাবাহিনীর ব্রিগেড এলাকা, বেতার এলাকা ও পুলিশ লাইন এলাকা এখন বন্যার পানিতে থই থই করছে। মানুষ নৌকায় করে জরুরি যাতায়াত করছেন। আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর আলম জানান, উপজেলায় জরুরি সমন্বয় সভা করা হয়েছে এবং উপজেলার ৪টি ইউনিয়নে আনুমানিক ১ হাজার ৩৩০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি বিভাগের মাধ্যমে ফসলের ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরির কাজ চলছে।
ত্রাণ ও সরকারি-বেসরকারি তৎপরতা
বান্দরবানের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও পৌর প্রশাসক এস এম মঞ্জুরুল হক জানান, বন্যার পানি ক্রমাগত বাড়ছে। শহরের পৌর এলাকার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে থাকা ৩ হাজার ৩০০ জন মানুষকে দুপুরে খাবার দেওয়া হয়েছে এবং রাতে আট হাজারেরও বেশি মানুষের জন্য খাবারের আয়োজন করা হচ্ছে।
পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোও এগিয়ে এসেছে। ব্র্যাক-এর জেলা সমন্বয়ক সুশান্ত বিশ্বাস জানান, তারা লামা, নাইক্ষ্যংছড়ি ও সদরের ৬৬৫টি পরিবারকে জরুরি খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছেন। অন্যদিকে, বলিপাড়া নারী কল্যাণ সংস্থার (বিএনকেএস) উপনির্বাহী পরিচালক উবানু মারমা জানান, বান্দরবান ও লামা এলাকার ১৬ হাজার বন্যায় দুর্গত পরিবারকে বিকাশের মাধ্যমে ৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
১৫ জুলাই পর্যন্ত পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ
সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি বিবেচনা করে জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধের মেয়াদ আগামী ১৫ জুলাই পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে জেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের অত্যন্ত সাবধানে চলাচলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
