ভারী বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারছে না দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ এলাকা। বিস্তীর্ণ জনপদ এখনো পানির নিচে। তবে এই দীর্ঘস্থায়ী বন্যা ও জলাবদ্ধতার জন্য কেবল প্রকৃতি নয়, বরং মানুষের তৈরি কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতাকেই দায়ী করছে প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড ।
অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী নিজেদের মাছ ও লবণের ঘের বাঁচাতে এবং অবৈধ উপায়ে মাছ শিকারের জন্য বেআইনিভাবে স্লুইসগেট (জলকপাট) বন্ধ করে রেখেছে। একই সঙ্গে খালের ওপর অবৈধ বাঁধ নির্মাণের ফলে বন্যার পানি নামতে পারছে না, যার খেসারত দিচ্ছে লাখ লাখ পানিবন্দি মানুষ।
স্বার্থান্বেষী মহলের জিম্মায় স্লুইসগেট
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্রে জানা গেছে, সমুদ্রের জোয়ারের লবণাক্ত পানি আটকানো এবং ভাটার সময় লোকালয়ের বৃষ্টির পানি সাগরে নামিয়ে দেওয়ার জন্য উপকূলীয় অঞ্চলে স্লুইসগেটগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল। দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও বান্দরবানের পাহাড়ি ঢল সাধারণত সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদী এবং বিভিন্ন সংযোগ খাল হয়ে মহেশখালী চ্যানেলের মাধ্যমে সাগরে মিশে যায়।
কিন্তু বর্তমানে এই স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। চট্টগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী তানজীর সাইফ আহমেদ জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্লুইসগেটগুলো খুলে দেওয়া হলেও স্থানীয় প্রভাবশালীরা নিজেদের স্বার্থে সেগুলো আবার বন্ধ করে দিচ্ছে। এছাড়া ঘের ব্যবসার জন্য খালের ওপর অবৈধ বাঁধ দেওয়ায় বন্যার পানি স্লুইসগেট পর্যন্ত পৌঁছাতেই পারছে না।
৩ ঘণ্টায় ৯ লাখ টাকার মাছ শিকার!
সম্প্রতি চকরিয়া উপজেলার বদরখালীর ডেমশিয়া এলাকায় পাঁচ কপাটের একটি স্লুইসগেট পরিদর্শনে গিয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখতে পান বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সাংবাদিক আলাউদ্দিন আলো।
তিনি জানান, স্থানীয় কিছু লোক কাঠের তক্তা দিয়ে স্লুইসগেটের বিশাল অংশ আটকে মাত্র চার ফুটের মতো সরু পথ খোলা রেখেছে। সেখানে জাল পেতে পানির স্রোত কমিয়ে মাছ ধরা হচ্ছিল। তথ্য পাওয়া গেছে, ওই স্থানে মাত্র ৩ ঘণ্টায় প্রায় ৯ লাখ টাকার মাছ ধরা হয়েছে। অর্থাৎ, অল্প কিছু মানুষের লাখ টাকার বাণিজ্যের জন্য লাখো মানুষের জীবনকে জলবন্দি করে রাখা হয়েছে।
অসহায় প্রশাসন, চলছে ‘চোর-পুলিশ’ খেলা
বেআইনিভাবে স্লুইসগেট বন্ধ ও বাঁধ নির্মাণের সত্যতা স্বীকার করে পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম বলেন,
“উপকূলীয় এলাকায় পানি এত দীর্ঘ সময় জমে থাকার কথা নয়। স্লুইসগেট বেআইনিভাবে বন্ধ রাখায় এই দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।”
এদিকে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউএনও শাহিন দেলোয়ার প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা ও স্থানীয়দের খামখেয়ালিপির কথা উল্লেখ করে জানান, গেট বন্ধের খবর পেলেই পুলিশ পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু পুলিশ চলে যাওয়ার পর স্থানীয় কিছু লোক অপারেটরদের প্রভাবিত করে নিজেদের স্বার্থে গেটগুলো আবার বন্ধ করে দিচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি
পানির প্রবাহ স্বাভাবিক করতে গত কয়েকদিন ধরে স্থানীয় প্রশাসন ও পাউবো কর্মকর্তারা মাঠে নেমে অবৈধ বাঁধগুলো কেটে দিচ্ছেন। নতুন করে যেন কেউ স্লুইসগেট বন্ধ করতে না পারে, সেজন্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও তদারকি জোরদার করা হয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সূত্র: দ্যা ডেইলি স্টার
