মিরপুরে চাঁদাবাজির ভয়াবহ নেটওয়ার্ক, মাসে কোটি টাকা আদায়

অবশ্যই পরুন

রাজধানীর মিরপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় চাঁদাবাজি চক্রের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কের চিত্র উঠে এসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এলাকায় দেড় শতাধিক চাঁদাবাজির স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে সংগঠিতভাবে দোকান, ফুটপাত, পরিবহনসহ বিভিন্ন খাত থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হচ্ছে।

তথ্য অনুযায়ী, এসব কার্যক্রমে অন্তত ৭২ জন সক্রিয়ভাবে জড়িত এবং প্রায় ২৫ জন ব্যক্তি তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন। তালিকায় রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি, পেশাদার অপরাধী এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের নামও রয়েছে।

মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে ১৩ নম্বর সেকশন পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায়, পাশাপাশি পল্লবী, কাফরুল, দারুস সালাম, রূপনগর, শাহ আলী ও ভাষানটেক থানার বিভিন্ন অংশে এই চাঁদাবাজির বিস্তার দেখা গেছে। ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা শত শত দোকান থেকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট হারে চাঁদা তোলা হয়। স্থানীয়দের মতে, দোকানের আকার ও অবস্থানভেদে প্রতিদিন ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। এ টাকা সংগ্রহে ‘লাইনম্যান’ নামে পরিচিত ব্যক্তিরা দায়িত্ব পালন করেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, শুধু মিরপুর ১০ থেকে ১৩ নম্বর সেকশন এলাকাতেই প্রায় ১,৪০০ থেকে ১,৭০০ দোকান ফুটপাত ও সড়ক দখল করে চলছে। প্রতিদিন গড়ে ২০০ টাকা করে আদায় ধরা হলে মাসিক চাঁদার পরিমাণ প্রায় ৯০ লাখ টাকায় পৌঁছায়। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থ বিভিন্ন স্তরে ভাগ হয়ে যায়।

চাঁদাবাজির পরিধি শুধু ফুটপাতেই সীমাবদ্ধ নয়। গাবতলী বাস টার্মিনাল, অটোরিকশার গ্যারেজ, লেগুনা স্ট্যান্ড, ভাঙারি ব্যবসা, বালু ও কয়লা বাণিজ্য, পোশাক কারখানার বর্জ্য, নির্মাণকাজ, বস্তি এবং অবৈধ বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ—এসব খাতেও নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, রাজধানীজুড়ে চাঁদাবাজদের একটি পৃথক তালিকা তৈরি করা হয়েছে, যেখানে এক হাজারের বেশি ব্যক্তির নাম রয়েছে। তালিকা প্রণয়নে থানা পুলিশ, গোয়েন্দা ইউনিটসহ সংশ্লিষ্ট শাখাগুলো কাজ করেছে। ইতোমধ্যে বিশেষ অভিযানে শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, নির্দিষ্ট সময় পরপর এসে চাঁদা আদায় করা হয়। বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য আলাদা টাকা দিতে হয়, এমনকি দোকান বন্ধ থাকলেও আগের দিনের চাঁদা পরিশোধ করতে বাধ্য করা হয়। চাঁদা না দিলে দোকান বসাতে না দেওয়া বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটে।

পরিবহন খাতেও একই চিত্র দেখা যায়। লেগুনা ও অন্যান্য যানবাহন থেকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়, যা মাস শেষে বড় অঙ্কে পরিণত হয়। এসব অর্থ সংগ্রহে সংগঠিত গোষ্ঠী কাজ করে, যাদের পেছনে প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া আবাসন প্রকল্প, জমি কেনাবেচা এবং নতুন ভবন নির্মাণের সময়ও চাঁদা দাবির ঘটনা ঘটছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। কোনো প্রকল্প শুরু হলেই নির্দিষ্ট গোষ্ঠী অর্থ দাবি করে এবং না দিলে হুমকি দেওয়া হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে চলমান বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বাহিনীর কোনো সদস্যের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের এই চাঁদাবাজি এখন একটি সংগঠিত অর্থনৈতিক অপরাধ কাঠামোয় পরিণত হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ ব্যবসায়ী ও নিম্নআয়ের মানুষ।

স্থানীয়দের দাবি, স্থায়ী সমাধানের জন্য নিয়মিত নজরদারি ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও আশা করছে, চলমান অভিযান অব্যাহত থাকলে এই নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

আরও নিবন্ধ

সর্বশেষ সংবাদ