১৯৪৭ সালে এই গাঙ্গেয় বদ্বীপে মধুমতির শাখানদী বাইগার নামক ছোট্ট তটিনীর কোলঘেষা গোপালগঞ্জ টুংগিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। ইতিহাসের অমোঘ কল্লোলে ১৯৪৭ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, ভারত- পাকিস্তান নতুন রাষ্ট্র হওয়া গুরুত্বপূর্ণ আলেখ্য। সে বছরই জানান দিচ্ছিল এই উপমহাদেশে আসন্ন সংঘাতপূর্ণ রাজনীতির অশনি সংকেত। বাবা তখন পুরোদস্তুর ছাত্রনেতা। কলকাতা, গোপালগঞ্জ যাওয়া আসা বঙ্গবন্ধুর নিত্যনৈমিত্তিক কার্যকলাপ। শৈশবে বাবার স্নেহবঞ্চিত হয়েছেন যাচিত কারনেই। ৪৯ এ আওয়ামীলীগ প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাবার স্নেহধন্য হতে না পারা দুর্ভাগ্য যতখানি, ততখানিই বাস্তব।
১৯৫৪ সালে বঙ্গবন্ধু যেবার যুক্তফ্রন্টের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হোন, সেবার পুরোনো ঢাকার রজনী বোস লেনের ছোট্ট ভাড়া বাড়িতে সপরিবারে ওঠার সুযোগ পান। বাবা কৃষিমন্ত্রী হওয়ার পর ৩ নাম্বার মিন্টু রোডে সরকারি বাসভবনে বসবাসের সুযোগ মেলে। বর্তমান শেরে বাংলা স্কুলে পড়াশুনা শেষে এসএসসি পাশ করেন আজিমপুর গার্লস স্কুল থেকে। বদরুন্নেসা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক সম্পন্ন করেন। কলেজ জীবনে তিনি ছাত্রসংসদের ভিপি এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ঢাবির রোকেয়া হলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হোন। বাবার ১৪ বছরের জেল জুলুমের দৃষ্টান্ত চোখের সামনে পরিস্ফুট। বাবাকে অসংখ্যবার জেলে দেখতে গিয়েছেন। মুলত ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বাবার আদর্শকে ধারণ করে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ম্যাগনাকার্টা মুক্তির সনদ ছয়দফার পক্ষে নিরলস ভাবে ক্যাম্পাসে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি risk aversion due to repression কে আত্নস্থ করে চাইলেই বাবার রাজনৈতিক সংগ্রামকে অবলম্বন করে বিখ্যাত হতেই পারতেন। সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণের কোন দরকারই ছিলনা। “যোগ্য পিতার যোগ্য মেয়ে” এই প্রবচন তিনি এমনি এমনি অর্জন করেননি। ক্রান্তিকালীন তাগিদ শেখ হাসিনাকে জীবনমুখী রাজনীতিতে বাবার আদর্শকে অবিনশ্বর করে রেখেছে।

তিনি এতটাই হতভাগ্য যে ১৯৬৮ সালে ওয়াজেদ মিয়ার সাথে বিয়ের সময়ও বাবা ছিলেন আগারতলা প্রহসনের মামলায় কারাগারে। জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহুর্তগুলোয় তিনি পিতাকে পাশে পাননি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি সপরিবারে অবরুদ্ধ ছিলেন ভিন্ন বাড়িতে, সামরিক নজরবন্দীতে। দেশ স্বাধীনের পর সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করেননি, কিন্তু বাবার কাছ থেকে রাজনৈতিক শিক্ষা পাওয়ার হাতে খড়ির ওই সময়টাই হয়ত তাকে জননেত্রী হিসেবে তৈরী করেছে।
৭৫ এর ১৫ আগস্ট কালরাত্রিতে তিনি, তার বোন ও স্বামী ছিলেন জার্মানিতে। নয়তো বাবার সাথে সপরিবারে তিনিও নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হতেন। হয়ত বঙ্গবন্ধু বেচে থাকলে তিনি সাধারণ গৃহিণী হতেন, বাঙ্গালি সাধারণ রমণীর মত পুত্র, কন্যা নিয়ে গতানুগতিক সাংসারিক নারী হতেন। কিন্তু স্রষ্টার ভাগ্য বিধানলিপি এতটা নির্মম হবে, ঘুণাক্ষরেও কেউ ভাবতে পারেনি। যেমন মনসামঙ্গলে কেউ ভাবেনি, লক্ষীন্দরও ফিরত্ব পারে। বলাবাহুল্য, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করে ৬ বছর সেখানে কাটান।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করে বাঙালি জাতির অস্তিত্বকে বিপন্ন করার জন্য নানামুখী ষড়যন্ত্র শুরু করে ঘাতকগোষ্ঠী । পঁচাত্তরের পরে ক্ষমতা দখলকারীরা এবং সামরিক জান্তা জিয়াউর রহমান তাঁকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করতে না দেওয়ার জন্য সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। বস্তুত, তাঁকে দেশে ফিরতে না দেওয়া ছিল সামরিক শাসকের একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল, যাতে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বশূন্য থাকতে বাধ্য হয় ।
ঠিক এমন এক ক্রান্তিলগ্নে, যখন বাঙালি জাতির জীবনে ঘোর অমানিশার অন্ধকার নেমে আসে , আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব একটি বিশাল শূন্যতার সম্মুখীন হয়। দলের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণের জন্য ১৯৮১ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় কাউন্সিলে একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাঁর অনুপস্থিতিতেই তাঁকে সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত করা হয় । আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছিল, অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক শাসক কর্তৃক সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতার প্রেক্ষাপটে কেবল বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকার বহনকারীই দলের পুনরুজ্জীবন ঘটাতে পারে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জাতির পিতার জ্যেষ্ঠ কন্যার হাতে দেশমাতৃকার মুক্তির সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার পবিত্র দায়িত্ব অর্পণ করা হয় ।
সামরিক শাসকের রক্তচক্ষু ও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দীর্ঘ ছয় বছর নির্বাসন শেষে প্রিয় স্বদেশভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেন শেখ হাসিনা । এই প্রত্যাবর্তন ছিল কেবল ব্যক্তির ফেরা নয়, এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক পুনর্প্রতিষ্ঠার ঘোষণা। সেদিন রাজধানী ঢাকা মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ঢাকা শহর মিছিল আর স্লোগানে প্রকম্পিত হতে থাকে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া এবং প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টিও সেদিন লাখ লাখ মানুষের মিছিলের গতিরোধ করতে পারেনি । কুর্মিটোলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও শেরেবাংলা নগর জনসমুদ্রে পরিণত হয় ।
জনতার কণ্ঠে বজ্রনিনাদে সেদিন ঘোষিত হয়েছিল, “হাসিনা তোমায় কথা দিলাম- পিতৃ হত্যার বদলা নেব” এবং “ঝড়-বৃষ্টি আঁধার রাতে- আমরা আছি তোমার সাথে” । এই গণআবেগই সামরিক জান্তার নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে তাঁর প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্যদিয়ে তিনি জনগণের উদ্দেশ্যে লেন, “সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি, আমি আওয়ামী লীগের নেত্রী হওয়ার জন্য নয়, বরং জনগণের বোন ও কর্মী হিসেবে আপনাদের পাশে থাকতে চাই।
পিতার আদর্শ ও দেশমাতৃকার তাগিদ – এই দুই উদ্দেশ্যই তাঁকে রাজনৈতিকভাবে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছিল। গণতান্ত্রিক আন্দোলন করতে গিয়ে শেখ হাসিনাকে কয়েকবার গৃহবন্দি হতে হয়েছে । দীর্ঘ ১৬ বছরের এই সংগ্রাম একজন বাঙালি নারীর জন্য কতটা কস্টদায়ক, তা বুঝতে পারা অবাস্তব কিছু না।
ভোট ও ভাতের আন্দোলন তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে ভিন্নমাত্রা প্রদান করেছিল। দীর্ঘ সংগ্রাম ও আন্দোলনের পর ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়। এর ফলস্বরূপ ২৩ জুন জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রী হন । এই শাসনামল ছিল দীর্ঘ ২১ বছর পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ক্ষমতায় ফেরা এবং সংসদীয় পদ্ধতির শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ।
শেখ হাসিনার দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো তাঁকে লক্ষ্য করে চালানো একাধিক হত্যাচেষ্টা। বারবার বিরোধী দল, জঙ্গী গোষ্ঠী আওয়ামীলীগ এবং তাকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে ভয়াবহ অপারেশন চালিয়েছে। ২০০০ সালে কোটালিপাড়া সফরের সময় ৭৬ কেজি গ্রেনেড দিয়ে তাকে হত্যার চেস্টা করা হয়, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা সকলের জানা। ২০০১ সালে সিলেট, খুলনাতেও হরকাতুল জিহাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হোন তিনি। তবুও থেমে থাকেনি এক জেলা থেকে অন্য জেলা সফরে। ভাত, ভোট, গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের অভিপ্রায় তাকে জনগণের হরিহর আত্না হিসেবে আত্নস্থ করেছিল। ২০২৪ সালে ষড়যন্ত্রমূলক আন্দোলনে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা মুলত পুর্বপ্রচেষ্টাকে সফল করা। শত্রুপক্ষ শেখ হাসিনার সম্মোহিত নেতৃত্ব ও দেশপ্রেমকে সহ্য করতে পারেনি। আশ্রয় নিয়েছে বিদেশী মদদ গোষ্ঠীর। সেসব কথা আজ থাক।
২০০৭-৮ ওয়ান ইলেভেন সরকারের সময় তাকে দেশের বাইরে রাখার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করা হলেও আবার সামরিক শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি দেশে ফেরেন। তাকে ফিরতেই হত। নয়ত বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা শশ্মানের ভস্মভূমি হত। তা শেখ হাসিনার চেয়ে ভালো আর কেই বা জানে!
২০০৯-২০২৪ শাসনামলে তিনি বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে এক অনন্য ভুমিকায় নিয়ে গেছেন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শতভাগ বিদ্যুৎ, মেগা প্রকল্প, ফার্স্ট ট্র্যাক প্রজেক্ট, কানেক্টিভিটি উন্নয়ন, ডিজিটাল বাংলাদেশ, স্মার্ট বাংলাদেশের রুপরেখা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী শক্তিশালি করণ সহ আরো অনেক উল্লেখযোগ্য প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার রোল মডেল হিসেবে মঞ্চস্থ করেছেন। সেসব গল্পও আরেকদিনের জন্য তোলা থাকল।
আজ জননেত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন। কতটুকু কয়লা আগুনে পুড়লে তা হীরা হয়, সেটা বিতর্কের বিষয়, কিন্তু দেশমাতৃকার প্রতি অবাধ ও স্বার্থহীন ভালোবাসায় তিনি বাবার মতই নি:স্বার্থ ও প্রগাঢ় হৃদয়ের অধিকারী। এই জন্মদিনে তাকে নিয়ে গিলগামেশ রচনা করা যায়, অনুসৃত মহাকাব্যও রচনা করা যায়। কিন্তু তিনি নিজেই জাত মহাকাব্যের পৌরণিক উপাখ্যান। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার মত এত ক্রান্তিকালীন রাজনৈতিক পরিচ্ছেদ ইতিহাসের অনুচ্ছেদ হয়ে থাকবে।
আপনি আবার ফিরে আসুন। আমাদের দেশমাতৃকার তাগিদে, জনগণের ভাতের নেমন্তন্নে, বস্ত্রের প্রয়োজনে, কথা বলার সারথী হয়ে। আপনাকে আসতেই হবে হে মাননীয়া। আপনি আসবেন বলে ধানমন্ডি ৩২ এর পোড়াবাড়িতে আবার গাছে ফুল ধরেছে। আপনার বয়স কত হল, সেটা গণনার বাইরে রাখলাম, আপনার দেশকে দেবার আরো যা যা আছে, সেই হিসেব থেকে আপনাকে মুক্তি দেবোনা। আমরা জানি, আপনি মুক্তি চানও না।
হে সুজন, প্রজ্ঞাবান, প্রগতিশীল প্রথিতযশা, -বাংলার সাধারণ জনগণ আপনার অপেক্ষায়।
আরেকটা বার ফিনিক্স হোন না! আরেকটা বার শাড়ি?
আধার বাংলা হোক না আবার জোনাকিদের বাড়ি।
শুভ জন্মদিন হে নেত্রী,
জয় বাংলা,
জয় বঙ্গবন্ধু
জয়তু শেখ হাসিনা।
লেখকঃ ডাক্তার কলিমুদ্দি
