ভারতের চাল দুবাই ঘুরে আসলে হিন্দুত্ববাদের ঘ্রাণ চলে যাবে?

অবশ্যই পরুন

ভারতীয় চাল দুবাই যাবে। সেখানে একটা আরব্য আরব্য লুক তৈরি হবে, হিন্দুত্ববাদী ঘ্রাণও কেটে যাবে। তারপর বাংলাদেশে আসবে। মনে করুন, অনেকটা লাল চাল সাদা করার মত ব্যাপার আর কি। তবে কালো টাকা সাদা করার মত কোনোকিছু না।

আরব আমিরাত। আনুমানিক আশি হাজার স্কয়ার ফিটের একটি পারস্য উপসাগরিয় দেশ। এক কোটির কাছাকাছি বা তার চেয়ে কিছুটা বেশি মানুষের দেশ। তবে তিন-চতুর্থাংশ নাগরিকই বেশ বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত। খনিজ তেল রিলেটেড নানাবিদ শিল্প ও বাণিজ্যই যাদের আয়ের মূল উৎস। এছাড়াও পর্যটন রিলেটেড ও বিভিন্ন বিলাসবহুল পণ্যের রমরমা ব্যবসা-বাণিজ্য বিদ্যমান।

মরুভূমি অধ্যূষিত এরিয়া হওয়া সত্ত্বেও কেবল খনিজ তেলের উপর ভর করে ব্যাপক উন্নতি লাভ করেছে তারা। উনিশশো পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু হওয়া খনিজ সম্পদ বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মূলত পাল্টে যায় তাদের রাষ্ট্রীয় চেহারা। অন্যদিকে ব্রিটিশরাও নিজেদেরকে গুটিয়ে নেয় শাসনব্যবস্থা থেকে। ঠিক তখনই সত্তরের দশকে সাতটি স্টেট বা আমিরাত (আমিরশাসিত অঞ্চল) একত্রিত হয়ে গঠন করে যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার, যা United Arab Emirate নামে পরিচিত। অতঃপর, বাংলাদেশের স্বাধীনতার বছরে তারাও একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

প্রায় বৃষ্টিপাতশূন্য এবং খানিকটা উত্তপ্ত অঞ্চল হেতু আরব আমিরাতে কোনো প্রকার খাদ্য শস্যের উৎপাদন হয় না। তবে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে স্বল্পায়ুর শাকসবজি ও অল্পকিছু ফলমূল উৎপাদন হয়, যেগুলো কৃত্রিম সেচব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। তারা মূলত কৃষিপণ্যের জন্য ভারতনির্ভর। অল্পকিছু আমদানি পাকিস্তান থেকেও হয়ে থাকে। বিভিন্ন ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স পণ্যের জন্য প্রধানত চায়নানির্ভর। অন্যদিকে তাদের প্রধান পর্যটক আকর্ষণ ভারত ও ইউরোপ থেকে।

তাহলে আমরা দুবাই থেকে চাল আনবো কেন? আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পুনঃরপ্তানি একটা টার্ম আছে। সাধারণত দুটি কারণে এটি হয়ে থাকে।
এক. দুটি দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক না থাকলে;
দুই. দুটি দেশের মধ্যে উচ্চমাত্রার ট্যারিফ হার বজায় থাকলে।
সেক্ষেত্রে কোনো বিশেষ দেশ থেকে সরাসরি পণ্য না এনে তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করা হয়। মনে করুন ইজরাইল সবচেয়ে ভালো হীরক রপ্তানি করে। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নাই। কিন্তু ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ভালো। ভারত তাদের থেকে হীরা আমদানি করে। বাংলাদেশ চাইলে ভারত থেকে ইজরাইলি হীরা ক্রয় করার সুযোগ আছে। ভারত নিজেদের চাহিদার সঙ্গে বাংলাদেশের চাহিদা যোগ করে প্রয়োজনীয় হীরক কিনতে পারে।

পুনঃরপ্তানির আরও কিছু কারণ থাকতে পারে, যেগুলো মূলত বাণিজ্য ও কোনো বিশেষ রাষ্ট্রনীতির আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এক. মনে করুন মি. ক আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী, তার সঙ্গে x দেশের সম্পর্ক ভালো এবং তিনি Y দেশে প্রতিনিধি রেখে ব্যবসা করেন, হতে পারেন তিনি X কিংবা Y যেকোনো দেশের নাগরিক। অন্যদিকে X দেশ চাইলে তার প্রতিবেশী বা সুবিধাজনক যোগাযোগসাপেক্ষে Z দেশ থেকে পণ্য আমদানি করতে পারে। কিন্তু X কোনো এক কারণে প্রতিবেশী Z থেকে পণ্য না কিনে মি. ক-এর মাধ্যমে Y দেশ থেকে পণ্য আমদানি করে, যা মূলত Z দেশ থেকেই আমদানিকৃত। সে কারণটার মূল প্রেক্ষাপট মি. ক। এখানে দুটো ব্যাপার। এক. X দেশ চাচ্ছে মি. ক কিছুটা লাভ করার সুযোগ পাক অথবা X দেশ চাচ্ছে মি. ক-এর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক উন্নত হোক।

এখন প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ কেন মরুভূমি থেকে চাল আমদানি করতে চায়? এখানে কি কোনো ‘মি. ক’-এর অস্তিত্ব বিদ্যমান, না কি বাংলাদেশের কাছে ভারত উচ্চমূল্যে চাল রপ্তানি করে যা দুবাই থেকে আমদানি খরচের চেয়ে বেশি, অথবা বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমিরাত সরকারের সঙ্গে উন্নত সম্পর্ক গড়ে তোলার বিকল্প কোনো মাধ্যম না পেয়ে চাল পুনঃআমদানির কৌশলটি বেছে নিয়েছে? এই তিনটির যেকোনো একটি হবে হয়তো।

সে যাহোক, যে জন্যই হোক, তা অবশ্যই বাংলাদেশের কল্যাণের জন্য হবে। সে কল্যাণ বস্তুগত কিংবা আধ্যাত্মিক যেকোনোটি হতে পারে। এটুকু বুঝতে হবে। ধৈর্য ধরে কল্যাণের অপেক্ষা করতে হবে।

লিখেছেনঃ অধ্যাপক হাফিজুর রহমান

আরও নিবন্ধ

সর্বশেষ সংবাদ