৫ আগস্ট পরবর্তী সংকট, মামলা-গ্রেপ্তারে বিপর্যস্ত তৃণমূল, তবুও চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের শিকড় ধরে রেখেছেন পূর্ব বাকলিয়ার এই নেতা
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি ।
৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধাক্কা সবচেয়ে বেশি লেগেছে তৃণমূলে। চট্টগ্রাম মহানগরীতে ওয়ার্ড পর্যায়ের শত শত নেতাকর্মী মামলা, গ্রেপ্তার ও আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।
এই শূন্যতার মধ্যেই চট্টগ্রামে আলোচনায় উঠে আসে এক নীরব কিন্তু সক্রিয় নাম — পূর্ব বাকলিয়া ১৮ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হারুন-অর-রশিদ দলের ভেতরে তাকে এখন বলা হচ্ছে ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’।
কে এই হারুন-অর-রশিদ জনি?
ছাত্রলীগ থেকে উঠে আসা এই নেতা দীর্ঘদিন ধরে বাকলিয়া এলাকায় জনপ্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত। কাউন্সিলর হিসেবে এলাকায় ড্রেনেজ, সড়ক সংস্কার, টিসিবি কার্ড বিতরণে তার সক্রিয়তার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে তার আলাদা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এই জনভিত্তিই দুঃসময়ে সংগঠনের জন্য কাজে লেগেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, হারুন তিনটি কৌশলে সংগঠন ধরে রেখেছেন —
১. বিকেন্দ্রীকৃত নেটওয়ার্ক: বড় মিছিল-সমাবেশের বদলে ১০-১৫ জনের ছোট ছোট ইউনিট। ওয়ার্ডকে ৮টি মহল্লা ব্লকে ভাগ করে প্রতিটি ব্লকের জন্য আলাদা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি নির্ধারণ। প্রতিদিন ব্যক্তিগত যোগাযোগ।
২. ‘জামিন সাপোর্ট সেল’ ও আইনি সহায়তা: গ্রেপ্তার হওয়া নেতাকর্মীদের পরিবারের সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ, স্থানীয় ৪-৫ জন আইনজীবীর সমন্বয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক প্যানেল তৈরি, মামলার তারিখ মনিটরিং, জামিনের কাগজপত্র দ্রুত প্রস্তুত করা। দলীয় সূত্র বলছে, গত এক বছরে অন্তত ৪০-৫০ জন নেতাকর্মী এই সহায়তায় জামিন পেয়েছেন।
৩. মানবিক কর্মসূচিতে মনোবল ধরে রাখা: কারাবন্দী নেতাকর্মীদের পরিবারের কাছে বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান গুলোতে ইফতার সামগ্রী, ঈদে নতুন পোশাক কোরবানির মাংস ও নগদ সহায়তা, অসুস্থ কর্মীর চিকিৎসার খরচ বহন। এছাড়া দলীয় সকল কর্মসূচি ও জাতীয় দিবসে ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস, ১৫ আগস্ট, ৩ নভেম্বর জেলহত্যা দিবস , বিজয় দিবসের মতো দিনগুলোতে ছোট পরিসরে দোয়া ও শহীদদের স্মরণসভা আয়োজন করে কর্মীদের মনোবল ধরে রাখা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের এক অধ্যাপক বলেন, “৫ আগস্টের পর অনেক নেতা ফেসবুক-কেন্দ্রিক রাজনীতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু হারুন-অর-রশিদের মডেল হলো ক্লাসিক গ্রাসরুট পলিটিক্স — লো-প্রোফাইল কিন্তু হাই-ইমপ্যাক্ট। সংগঠন টিকে থাকে সম্পর্ক আর উপস্থিতির ওপর, শুধু প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে নয়।”
স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যখন বড় নেতারা এলাকা ছেড়েছেন, তখন হারুন অর রশিদ এর মতো ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতারাই কর্মীদের ভরসা দিয়েছেন। এই মুহূর্তে এটাই সবচেয়ে বড় রাজনীতি।
দলীয় অভ্যন্তরে অনেকেই মনে করছেন, এই দুঃসময়ে যারা মাঠে থেকে তৃণমূলকে আগলে রাখছেন, তারাই আগামী দিনে সাংগঠনিকভাবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হবেন। কেন্দ্রীয় সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলেও বাকলিয়া ১৮ নং ওয়ার্ডের এই মডেল এখন চট্টগ্রামের অন্যান্য ওয়ার্ডেও অনুসরণ করা হচ্ছে।
যদিও হারুন-অর-রশিদ নিজে এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি, তবে তার ঘনিষ্ঠজনরা জানান, পদ-পদবির জন্য নয়, কর্মীদের বিপদে পাশে থাকাই এখন প্রধান লক্ষ্য।
রাজনীতির বড় মঞ্চে আলো না থাকলেও, মাঠের বাস্তবতায় যাদের উপস্থিতি সংগঠনকে টিকিয়ে রাখে — হারুন-অর-রশিদ এখন সেই কাতারেই।
