রোটন ভাইকে রাউজানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাও রাষ্ট্রীয় পুলিশি নিরাপত্তায়! না, রোটন ভাই রাউজানের এমপি হিসেবে যাচ্ছেন না। যে স্বপ্নটা তিনি সারাটা জীবন দেখেছেন, সেভাবে তাঁকে পুলিশি নিরাপত্তা দিয়ে নেওয়া হচ্ছে না। নেওয়া হচ্ছে তাঁর মৃতদেহকে ভয় পেয়ে।
ঢাকার ধানমণ্ডিতে রোটন ভাইয়ের দ্বিতীয় জানাজা হওয়ার কথা ছিল। এর আগে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে বিজিবির কড়া নিরাপত্তায় তাঁর লাশ বাংলাদেশে প্রবেশ করে। একটা পারমাণবিক বোমাকেও এতটা নিরাপত্তা দেওয়া হয় না। ছাত্রলীগের একজন সাবেক নেতার মৃতদেহকেও এত ভয় পায় এই অবৈধ স্বৈরাচারী সরকার।
ধানমণ্ডির তাকওয়া মসজিদের সামনে যারা একজন মৃত মানুষের জানাজায় অংশ নিতে গিয়েছিলেন, তাঁদের সবাইকে মব সৃষ্টি করে পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়। এরপর ছাত্রদল-শিবিরের সন্ত্রাসীরা এসব নিরপরাধ মানুষকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। বিএনপির অবৈধ সরকারের মন্ত্রী রবিউল নিজে উপস্থিত থেকে এসব করিয়েছেন।
রোটন ভাই ঢাকা শহরে বড় হয়েছেন। এই শহরে তার কতো শুভাকাঙ্ক্ষী, আত্মীয়, পরিজন, বন্ধুবান্ধব- অথচ সেই শহরেই তাঁর জানাজায় অংশ নেওয়ার নুন্যতম মানবাধিকারটুকু কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের শাসনামলে জুলাইযোদ্ধা ফারাজের বাবা ফজলে করিম চৌধুরী ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটনকে নিজ এলাকায় প্রবেশ করতে দেননি। রোটন ভাইয়ের বাবার কুলখানিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও অপমানিত হয়েছিলেন। খাবার টেবিলে থাকাকালীন বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল।
মনে পড়ে, নদীভাঙন থেকে আমার দৌলতখান উপজেলাকে রক্ষার দাবিতে দাঁড়ানোয় এমপি মুকুল আমার বাসার বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলেন। এতে আমার মা- যিনি একজন গেজেটেড বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান- তিনি এবং তাঁর পরিবারকে কষ্ট পোহাতে হয়েছিল।
ফজলের মতো মুকুলও আজ মিথ্যা মামলায় জেলে। তাঁদের জুলাই সন্ত্রাসী ছেলে-মেয়েদের কর্মকাণ্ডের পরিণতিতেই আজ তাঁদের এই অবস্থা।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে কত রোটন যে নিজ এলাকায় দলের মালিকদের কাছে সম্মান পাননি, এসব এমপি লীগের গুন্ডাদের কারণে- সেসবের অভিশাপ থেকেই ৫ আগস্ট এসেছে। এটাও অন্যতম কারণ। দল ঐক্যবদ্ধ থাকেনি, দেশে অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট মনোভাব স্বাভাবিক হতে শুরু করে। একসময় দলে ও দেশে ফাটল ধরে, সেখান থেকেই ষড়যন্ত্রের সুযোগ নিয়ে পতন। আওয়ামী লীগের বহু এমপি, মন্ত্রী ও নেতার ছেলেমেয়েরা কেন শেখ হাসিনার পতন চেয়েছিল? এসব নেতা নিজেদের ঘর সামলাতে না পারলেও ছাত্রলীগের পিঠের চামড়া তুলতে ঠিকই ওস্তাদ ছিলেন।
দলের এই ক্রান্তিলগ্নে ভোলা জেলা ছাত্রলীগের কমিটিতে আমার আপন সহোদর অংকন সাংগঠনিক পদ পাওয়ার পর, আমার উপজেলার তোফায়েল কোটার এমপি এবং প্রতিবন্ধী জুলাইযোদ্ধা ঐশীর বাবা মুকুলের এক গুন্ডা আমার ভাইকে মারার হুমকি দিয়েছে। সেই ক্ষমতা এদের থাকুক আর নাই থাকুক, এই সময়ে এসব চিন্তা করতে পারেন দলের কেউ? এই সময়ে ছাত্রলীগের পদ পেলেই সারা দেশে ছাত্রদল ও শিবির হুমকি দেয়। আর আমার এলাকায় হুমকি দিচ্ছে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপির ব্যক্তিগত গুন্ডারা।
৫ আগস্টের মতো দিন আসার পরও এদের আচরণে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসেনি। কারণ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকায় এদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। এরা সারাজীবন বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে আঁতাতবন্ধ ছিলো, এখনো আছে। ব্যক্তিগত গুণ্ডা হওয়া ছাড়া এদের কোনো দলীয় আদর্শ বলতে কিছু নেই।
তাই এদের সাইকোলজি এখনো সেই আওয়ামী লীগবিরোধী, বঙ্গবন্ধুবিরোধী ও একাত্তরবিরোধী ব্যক্তিস্বার্থসর্বস্ব এমপিলীগ ও চামচালীগের মানসিকতায় আটকে আছে। দল পুনর্গঠন করতে হবে, দলের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে- এসব এখনো এদের মাথায় আসেনি। এখনো এদের প্রধান শত্রু ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের প্রকৃত নেতাকর্মীরা, আর মিত্র বিএনপি-জামায়াত। আওয়ামী লীগের ক্ষমতার সময়েও এরা বিএনপি-জামায়াতের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেনি, এখনো করে না।
ঠিক যেমন ফারাজ করিম চৌধুরী- বাংলাদেশে চামচালীগের সবচেয়ে বড় প্রতীক এই ফারাজ চরিত্রটি। ফারাজকে উদাহরণ হিসেবে বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যাবে, বিভিন্ন এলাকায় কীভাবে প্রচণ্ড আওয়ামী লীগবিরোধী, ছাত্রলীগবিরোধী, শেখ হাসিনাবিরোধী, বঙ্গবন্ধুবিরোধী ও স্বাধীনতাবিরোধী হয়েও এরা আওয়ামী লীগের মালিক সেজে ছিল।
ক্ষমা করবেন, রোটন ভাই। আমি-আমরাও ভালো নেই। আগুনের দিন কবে শেষ হবে, জানি না।
- হামজা রহমান অন্তর
- উপ-সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ
১১ অক্টোবর ২০২৬, লন্ডন, যুক্তরাজ্য
‘নির্বাসন থেকে লিখছি’
