বাংলাদেশের উন্নয়ন-ইতিহাসে কিছু অবকাঠামো কেবল ইট, পাথর, কংক্রিট আর ইস্পাতের সমষ্টি নয়, তারা হয়ে ওঠে একটি সময়ের সক্ষমতার দৃশ্যমান প্রতীক। পদ্মা সেতু তেমনই এক স্থাপত্য-অর্জন। এটি কেবল পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সেতু নয়; এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটানোর এক ঐতিহাসিক অবকাঠামোগত অভিযাত্রা।
এই সেতুর ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এর স্বপ্ন একদিনে জন্ম নেয়নি। ১৯৯৮–১৯৯৯ সালে পদ্মা সেতুর প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং ৪ জুলাই ২০০১ সালে মাওয়া প্রান্তে পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রকল্পটি নতুন বাস্তবায়ন-পর্বে প্রবেশ করে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল জানুয়ারি ২০০৯ থেকে জুন ২০২৪ পর্যন্ত এবং প্রকৃত ব্যয় ৩০,৭৭০ কোটি ১৩ লাখ ৫৫ হাজার টাকা।
২৫ জুন ২০২২ বাংলাদেশের অবকাঠামো ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করেন। পরদিন, ২৬ জুন ২০২২ সকাল ৬টা থেকে সেতুটি সাধারণ যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
কিন্তু পদ্মা সেতুর তাৎপর্য তার দৈর্ঘ্য কিংবা নির্মাণব্যয়ের পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রকৃত মাহাত্ম্য নিহিত রয়েছে এর ভূ-অর্থনৈতিক অভিঘাতে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের হিসাবে, সেতুটির ফলে দেশের প্রায় ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটার, মোট ভূখণ্ডের প্রায় ২৯ শতাংশ এলাকাজুড়ে তিন কোটিরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে রাজধানী ও দেশের পূর্বাঞ্চলের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যেই এই সেতু নির্মিত হয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষার হিসাবে জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ১ দশমিক ২০ শতাংশ এবং সরকারি প্রকল্প নথিতে সমাপ্তির পর অতিরিক্ত প্রায় ১ দশমিক ২৩ শতাংশ ইতিবাচক প্রভাবের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ রয়েছে।
সেতুর ওপারে যে নতুন বাংলাদেশ:
একসময় দক্ষিণবঙ্গের মানুষের কাছে ঢাকা ছিল যেন একটি নদীর ওপারের দূরবর্তী নগরী। ফেরিঘাটের দীর্ঘ অপেক্ষা, নদী পারাপারের অনিশ্চয়তা এবং পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয়ের কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিপুল উৎপাদনশীলতা জাতীয় অর্থনীতির মূল স্রোতে প্রত্যাশিত মাত্রায় যুক্ত হতে পারেনি। পদ্মা সেতু সেই ভূগোলকে পাল্টে দিয়েছে।
একজন কৃষক এখন দ্রুততার সঙ্গে তাঁর পণ্য রাজধানীর বাজারে পাঠানোর সুযোগ পান। শিল্প উদ্যোক্তার কাছে কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহনের নতুন পথ তৈরি হয়েছে। পর্যটনের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে নতুন করিডোর। দক্ষিণাঞ্চলের বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো পেয়েছে রাজধানীকেন্দ্রিক বাজারের সঙ্গে দ্রুততর সংযোগ।
আর এখানেই পদ্মা সেতুর সবচেয়ে বড় সাফল্য এটি নিজে কোনো বিচ্ছিন্ন অবকাঠামো নয়; বরং দক্ষিণবঙ্গের বহু প্রকল্পকে একই অর্থনৈতিক অক্ষের সঙ্গে যুক্ত করার কেন্দ্রীয় সেতুবন্ধন।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রকল্প-নথিতেও বলা হয়েছে, পদ্মা সেতুর মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, কাঁচামাল দ্রুত সরবরাহ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মোংলা বন্দরকে অধিকতর কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে এটি এশিয়ান হাইওয়ে রুট AH-1-এর সঙ্গে সংযোগের সম্ভাবনাও সৃষ্টি করে।
১৯৯৬–২০০১: যে ভিত্তির ওপর পরবর্তী মহাকর্মযজ্ঞ:
দক্ষিণবঙ্গের উন্নয়নকে শুধু ২০০৯–২০২৪ সালের প্রকল্প দিয়ে বিচার করলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। শেখ হাসিনার প্রথম সরকার, ১৯৯৬–২০০১ মেয়াদে, দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ, শিল্প ও শিক্ষা অবকাঠামোর বেশ কিছু ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
৩০ মে ২০০১ খুলনার রূপসা নদীর ওপর সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একই সময় দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন নদী ও সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নে একাধিক সেতু ও সড়ক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো, এই সময়েই পদ্মা সেতুর প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং পরবর্তীতে প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তুতি এগিয়ে যায়।
অর্থাৎ ১৯৯৬–২০০১ ছিল অনেকাংশে ভিত্তি নির্মাণের সময়, আর ২০০৯–২০২৪ হয়ে ওঠে সেই ভিত্তিকে বৃহৎ জাতীয় অবকাঠামোতে রূপ দেওয়ার সময়।
মোংলা EPZ: শিল্পায়নের দক্ষিণ দুয়ার:
দক্ষিণবঙ্গের শিল্পায়নের ইতিহাসে ১৯৯৮ সাল একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। ওই বছর বাগেরহাটের মোংলা বন্দর এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় মোংলা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা Mongla EPZ (মংলা ইপিজেড)।
BEPZA-এর তথ্য অনুযায়ী, ৩০২ দশমিক ৯৭ একর এলাকাজুড়ে প্রতিষ্ঠিত এই EPZ-তে ২৭৮টি শিল্প প্লট রয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন শিল্পে বিনিয়োগ, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের উল্লেখযোগ্য বিস্তার ঘটেছে। BEPZA-এর বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, মোংলা EPZ-তে বিনিয়োগের পরিমাণ ২৭১ দশমিক ৪৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং কর্মসংস্থান ১৬ হাজার ২১০ জনের মতো।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, ২০০০–০১ অর্থবছরে মোংলা EPZ-তে কর্মসংস্থান ছিল মাত্র ১০ জন; ২০২২–২৩ সালে তা বেড়ে ১৪ হাজার ৪৬৮ জনে পৌঁছে।
এটি নিছক একটি শিল্পাঞ্চলের পরিসংখ্যান নয়; এটি দক্ষিণবঙ্গের অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি প্রতিচ্ছবি। একসময় যে অঞ্চলের অর্থনীতি মূলত কৃষি, মৎস্য ও বনসম্পদের ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেখানে তৈরি হয়েছে শিল্প, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের নতুন ভিত্তি। BEPZA নিজেও মোংলা EPZ-কে দক্ষিণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের একটি প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেছে।
পদ্মা সেতুর পর মোংলার নতুন সম্ভাবনা:
মোংলা EPZ-এর সঙ্গে পদ্মা সেতুর সম্পর্কটিও গুরুত্বপূর্ণ। BEPZA-এর বর্তমান বর্ণনায় বলা হয়েছে, পদ্মা সেতু মোংলা EPZ-এর যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করেছে এবং অঞ্চলটিকে শিল্প বিনিয়োগের জন্য অধিকতর আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
এখানে একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে-
পদ্মা সেতু → উন্নত সড়ক যোগাযোগ → মোংলা বন্দর → মোংলা EPZ → শিল্প ও রপ্তানি → কর্মসংস্থান।
এই সমীকরণই দক্ষিণবঙ্গের উন্নয়নের নতুন অর্থনৈতিক দর্শনের ভিত্তি।
রেললাইন পৌঁছেছে মোংলা বন্দরে:
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নে আরেকটি যুগান্তকারী সংযোজন খুলনা–মোংলা রেললাইন। এর ফলে মোংলা বন্দরকে দেশের জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার পথ সুগম হয়েছে। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পও ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত নতুন রেলপথ নির্মাণের বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ।
সরকারি প্রকল্প নথি অনুযায়ী, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের মূল রুট প্রায় ১৭২ কিলোমিটার এবং লুপ ও সাইডিংসহ মোট ট্র্যাক প্রায় ২১৫ দশমিক ২২ কিলোমিটার। প্রকল্পে ৬৬টি বড় সেতু, ২৪৪টি ছোট সেতু/কালভার্ট/আন্ডারপাস এবং ১৪টি নতুন স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থাৎ পদ্মা সেতু কেবল সড়কপথের দক্ষিণমুখী বিপ্লব নয়; এটি রেল, সড়ক ও বন্দর তিনটি পরিবহন ব্যবস্থাকে একই অর্থনৈতিক জালের মধ্যে আনার প্রচেষ্টা।
রামপাল: দক্ষিণবঙ্গের বিদ্যুৎ অবকাঠামোর আরেক স্তম্ভ:
বাগেরহাটের রামপালে নির্মিত ১,৩২০ মেগাওয়াটের মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রকল্প দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বৃহৎ বিদ্যুৎ অবকাঠামোর একটি। প্রকল্পটি বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের ৫০:৫০ যৌথ উদ্যোগ বাংলাদেশের BPDB এবং ভারতের NTPC-এর অংশীদারিত্বে বাস্তবায়িত। দুটি ইউনিটের প্রতিটির ক্ষমতা ৬৬০ মেগাওয়াট। প্রকল্পটির অনুমোদিত ব্যয় ছিল প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা।
রামপালের ভৌগোলিক অবস্থানও তাৎপর্যপূর্ণ খুলনা শহরের দক্ষিণে এবং মোংলা বন্দরের নিকটে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, মোংলা বন্দর, EPZ ও যোগাযোগ অবকাঠামোর সমন্বয়ে এখানে একটি শিল্পভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে ওঠার অবকাঠামোগত সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।
পায়রা: নদীবন্দর থেকে জাতীয় অর্থনীতির নতুন প্রবেশদ্বার:
দক্ষিণবঙ্গের উন্নয়ন-মানচিত্রে পটুয়াখালীর পায়রা বন্দর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০১৩ সালে পায়রা বন্দর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ১৩ আগস্ট ২০১৬ সীমিত আকারে এর কার্যক্রম শুরু হয়।
পরবর্তীতে বন্দরকে কেন্দ্র করে টার্মিনাল, ক্যাপিটাল ড্রেজিং, সংযোগ সড়ক ও সেতুসহ একাধিক বৃহৎ প্রকল্প নেওয়া হয়। ২৭ অক্টোবর ২০২২ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পায়রা বন্দরকেন্দ্রিক প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
পায়রা বন্দরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ছয় লেনের সংযোগ সড়ক এবং আন্দারমানিক নদীর ওপর সেতু নির্মাণের উদ্যোগ। ফলে পটুয়াখালী ও বরিশাল অঞ্চলকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার অবকাঠামো তৈরি হয়েছে।
পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র: শিল্পায়নের শক্তি:
পটুয়াখালীর পায়রায় নির্মিত ১,৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র দক্ষিণাঞ্চলের বিদ্যুৎ অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করেছে। ২১ মার্চ ২০২২ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধন করেন।
রামপাল ও পায়রা দুটি ১,৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রকে দক্ষিণাঞ্চলের বৃহত্তর শিল্প ও বন্দর অবকাঠামোর সঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, দক্ষিণবঙ্গের উন্নয়ন কেবল যোগাযোগকেন্দ্রিক ছিল না; এর সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পায়নের সক্ষমতাও সমান্তরালে গড়ে তোলা হয়েছে।
ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো:
দক্ষিণবঙ্গের উন্নয়ন বিশ্লেষণে বিদ্যুতায়নকে বাদ দিলে চিত্রটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ বিদ্যুতায়ন কর্মসূচি দেশের প্রায় ৪৬২টি উপজেলায় পৌঁছেছে এবং গ্রামীণ জীবন, শিক্ষা, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোগে এর বহুমাত্রিক প্রভাব পড়েছে।
২১ মার্চ ২০২২ বাংলাদেশে শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘোষণা দেওয়া হয়। এই অর্জনের সামাজিক তাৎপর্য কেবল বিদ্যুতের সংযোগে সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যুৎ এসেছে সেচে, ক্ষুদ্র শিল্পে, দোকানে, শিক্ষার্থীর পড়ার টেবিলে, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, যোগাযোগ ও ডিজিটাল সেবায়।
অন্ধকার থেকে আলোয় এই রূপান্তরই উন্নয়নের সবচেয়ে নীরব অথচ সবচেয়ে গভীর পরিবর্তনগুলোর একটি।
ভোলার মাটির নিচে জ্বালানির সম্ভাবনা:
দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে ভোলার গ্যাসক্ষেত্রের কথাও উল্লেখযোগ্য। শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের পর ২০০৯ সালে গ্যাস উৎপাদন শুরু হয়। ২০১৮ সালে ভোলা নর্থ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয় এবং ২০২৩ সালে ইলিশা-১ কূপে নতুন গ্যাসের সন্ধান পাওয়া যায়।
ইলিশা-১-এর সম্ভাব্য মজুদ নিয়ে প্রাথমিক হিসাব দক্ষিণাঞ্চলের জ্বালানি সম্ভাবনাকে নতুন গুরুত্ব দেয়। ফলে ভোলার গ্যাসকে বরিশাল ও খুলনা অঞ্চলের শিল্প ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনাও সামনে আসে।
এখানে উন্নয়নের আরেকটি সূত্র স্পষ্ট-
যোগাযোগের অবকাঠামো + বিদ্যুৎ + গ্যাস + শিল্প = আঞ্চলিক অর্থনীতির নতুন ভিত্তি।
যশোরে প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত:
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নকে কেবল কৃষি ও শিল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি শেখ হাসিনার সরকার; তথ্যপ্রযুক্তিকেও যুক্ত করেছে।
যশোরের শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, পার্কটির উদ্বোধন করা হয় ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭। এখানে ৬১টি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে স্থান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা ২,০০০-এর বেশি।
এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তরুণদের জন্য একটি নতুন অর্থনৈতিক কল্পনার দ্বার খুলে দেয় যেখানে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র শুধু কৃষিজমি, কলকারখানা কিংবা সরকারি চাকরি নয়; সফটওয়্যার, আইটি, আউটসোর্সিং, স্টার্টআপ ও ডিজিটাল সেবাও হতে পারে।
কৃষি থেকে কৃষি-অর্থনীতি:
দক্ষিণাঞ্চলের কৃষির বড় সমস্যা ছিল লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, অনুন্নত পানি ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি। এসব মোকাবিলায় দক্ষিণাঞ্চলের জন্য কৃষি উন্নয়নের পৃথক মাস্টার প্ল্যান গ্রহণ করা হয়।
২০১৩ সালে কৃষি মন্ত্রণালয় ও FAO-এর যৌথ উদ্যোগে Master Plan for Agricultural Development in the Southern Region of Bangladesh চালু হয়। এর লক্ষ্য ছিল লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা মোকাবিলা, পতিত জমি চাষের আওতায় আনা, আধুনিক জাত ও প্রযুক্তির ব্যবহার, সেচ এবং উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি।
পরবর্তী সময়ে বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা, ঝালকাঠি, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় কৃষি সম্প্রসারণ, কৃষক প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী, জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তি এবং উন্নত বীজের ব্যবহার বাড়ানোর প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে।
অর্থাৎ কৃষিকে শুধু খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্র হিসেবে না দেখে কৃষিকে বাজার, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মূল্য সংযোজন ও গ্রামীণ আয়ের ভিত্তিতে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নারী উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা:
উন্নয়ন তখনই মানবিক অর্থ পায়, যখন তার সুফল সমাজের দুর্বল মানুষের জীবনেও পৌঁছায়।
১৯৯৬–৯৭ অর্থবছর থেকে VGD কর্মসূচি, ১৯৯৮–৯৯ অর্থবছর থেকে বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারীদের ভাতা, ২০০৭–০৮ অর্থবছর থেকে মাতৃত্বকালীন ভাতা এবং ২০১০–১১ অর্থবছর থেকে ল্যাক্টেটিং মাদার ভাতা চালুর মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষার পরিধি বাড়ানো হয়।
বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় ২০২২–২৩ অর্থবছরেই বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা কর্মসূচির আওতায় দুই লাখের বেশি নারী ছিলেন। এটি দক্ষিণাঞ্চলের দরিদ্র নারীদের সামাজিক নিরাপত্তার একটি উল্লেখযোগ্য চিত্র।
অর্থাৎ দক্ষিণবঙ্গের উন্নয়নের গল্প শুধু সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের নয়; এটি নারীর সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা এবং দরিদ্র পরিবারের জীবনমান উন্নয়নেরও গল্প।
আশ্রয়ণ: ঠিকানাহীন মানুষের ঠিকানা:
উন্নয়নের আরেকটি মানবিক অধ্যায় আশ্রয়ণ প্রকল্প।
২০২৪ সালের ১৫ জুন বরিশাল জেলার ১০টি উপজেলাকে ভূমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত ঘোষণা করা হয়। আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের পঞ্চম পর্যায়ের দ্বিতীয় ধাপে ৮০৭টি পরিবারকে জমিসহ ঘর হস্তান্তর করা হয়।
একটি ঘর এখানে কেবল চার দেয়ালের কাঠামো নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে জমির মালিকানা, বিদ্যুৎ, পানি, সামাজিক মর্যাদা এবং স্থায়ী ঠিকানা।
উন্নয়নের অভিধানে এটিই অবকাঠামোর মানবিকীকরণ।
শিক্ষা: উন্নয়নের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী অবকাঠামো
একটি অঞ্চলের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু সেতু, মহাসড়ক কিংবা বিদ্যুৎকেন্দ্র দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের সবচেয়ে স্থায়ী অবকাঠামো হলো শিক্ষা। কারণ সড়ক একটি প্রজন্মকে চলাচলের সুযোগ দেয়, কিন্তু শিক্ষা বহু প্রজন্মের সক্ষমতা নির্মাণ করে।
এই জায়গায় দক্ষিণবঙ্গের পরিবর্তন বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বরিশাল ও খুলনা বিভাগের সরকারি কলেজগুলোর তালিকায় বরিশাল সরকারি কলেজ, বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজ, বিএম কলেজ, ভোলা সরকারি কলেজ, ফজিলাতুন্নেছা সরকারি মহিলা কলেজ, পটুয়াখালী সরকারি কলেজ, পটুয়াখালী সরকারি মহিলা কলেজ, পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ, যশোর সরকারি কলেজ, যশোর সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি এম এম কলেজ, সরকারি বিএল কলেজ, সরকারি জয়বাংলা কলেজ, সরকারি সুন্দরবন আদর্শ কলেজসহ বহু প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
অর্থাৎ দক্ষিণবঙ্গের শিক্ষা অবকাঠামোকে কেবল নতুন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নয়, বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্প্রসারণ, একাডেমিক ভবন, বিজ্ঞান ও আইসিটি সুবিধা এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধির সমন্বিত প্রক্রিয়ায় দেখতে হবে। জাতীয় পর্যায়ের সরকারি শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচিতেও সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে নতুন একাডেমিক ভবন, মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ, বিজ্ঞান ল্যাব, আইসিটি সরঞ্জাম, লাইব্রেরি ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২২–২৩ সালের বাজেট বক্তৃতায় ২০০ সরকারি কলেজে অবকাঠামো ও আইসিটি উন্নয়নের প্রকল্প এবং ৩২৩টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়: দক্ষিণাঞ্চলের মেধার নতুন ঠিকানা
বরিশালবাসীর দীর্ঘদিনের উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষার বাস্তব রূপ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির নিজস্ব ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে, বরিশালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ১৯৬০-এর দশক থেকেই চলে আসছিল এবং দীর্ঘ সময়ের জনদাবির পর তা বাস্তব রূপ পায়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টি দক্ষিণাঞ্চলের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হচ্ছে।
আজকের বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসরও তার অগ্রগতির সাক্ষ্য বহন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ১,৬২৯ জনের বেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও প্রশাসনিক বিকাশের সঙ্গে ২০টি বিভাগ এবং ৮,১৭৯ জন নিয়মিত শিক্ষার্থীর উল্লেখ রয়েছে।
এই প্রতিষ্ঠান শুধু ডিগ্রি দেওয়ার জায়গা নয়; দক্ষিণাঞ্চলের মেধাকে নিজ ভূখণ্ডে ধরে রাখার একটি কৌশলগত প্রতিষ্ঠান। ফলে একজন পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠি, ভোলা বা পিরোজপুরের শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষার জন্য সবসময় ঢাকামুখী হতে হয় না এটি আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়: কৃষি ও প্রযুক্তির সেতুবন্ধন
দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির সঙ্গে কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও জলবায়ু বাস্তবতার নিবিড় সম্পর্ক। সেই কারণে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এ অঞ্চলের উন্নয়ন-দর্শনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
কৃষি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাকে স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা হলে কৃষকের উৎপাদনশীলতা, কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন, প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন এবং খাদ্যনিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় এখানে কেবল শিক্ষার প্রতিষ্ঠান নয় আঞ্চলিক অর্থনীতির জ্ঞানভিত্তিক অবকাঠামো।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও আইসিটি অর্থনীতি
খুলনা বিভাগের পশ্চিমাঞ্চলে উচ্চশিক্ষা ও প্রযুক্তির বিকাশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। একই সঙ্গে যশোরে শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক স্থাপনের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি, সফটওয়্যার ও কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি নতুন সংযোগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, যশোর সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের প্রকল্পটি ২০১৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর উদ্বোধন করা হয়। সেখানে ৬১টি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং ২,০০০-এর বেশি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
এটি দক্ষিণবঙ্গের উন্নয়ন-দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নির্দেশ করে। একসময় যেখানে উন্নয়ন মানে ছিল রাস্তা, সেতু ও বিদ্যুৎ, সেখানে এখন উন্নয়নের সঙ্গে সফটওয়্যার, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ, ডিজিটাল সেবা ও জ্ঞানভিত্তিক কর্মসংস্থানও যুক্ত হয়েছে।
চিকিৎসা শিক্ষা: স্বাস্থ্যসেবা ও মানবসম্পদের দ্বৈত বিনিয়োগ
দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নকে স্বাস্থ্যশিক্ষা থেকে আলাদা করা যায় না। যশোর মেডিকেল কলেজ ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত সরকারি মেডিকেল কলেজ হিসেবে চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, এখানে পাঁচ বছর মেয়াদি এমবিবিএস শিক্ষা এবং বাধ্যতামূলক এক বছরের ইন্টার্নশিপ রয়েছে।
পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজও ২০১৪ সালে অনুমোদিত নতুন মেডিকেল কলেজগুলোর একটি। পরবর্তী সময়ে এর হাসপাতাল ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য সরকারি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
খুলনায় শেখ হাসিনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণার পরিধি আরও বিস্তৃত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ২০২২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য সরকারি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়।
অন্যদিকে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য ২০১৫ সালে আইন প্রণয়ন করা হয়। আইনে কৃষি বিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও হস্তান্তরের সুযোগ সৃষ্টি এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিকে এর অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ দক্ষিণবঙ্গের শিক্ষা অবকাঠামো এখন মানবিক শিক্ষা থেকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কৃষি ও চিকিৎসা সব ক্ষেত্রেই বিস্তৃত হচ্ছে।
গ্রামীণ সড়ক কৃষককে বাজারে পৌঁছে দিয়েছে:
দক্ষিণবঙ্গের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনায় জাতীয় মহাসড়কের পাশাপাশি ইউনিয়ন ও উপজেলা সড়ককে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। কারণ পদ্মা সেতু তখনই অর্থনৈতিক অর্থবহতা পায়, যখন তার সংযোগ সড়ক প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষক ও উদ্যোক্তাকে বাজারে পৌঁছে দেয়।
বরিশাল বিভাগের উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পে প্রায় ৬১৬.৭৩ কিলোমিটার উপজেলা সড়ক, ১৬৩.২৪ কিলোমিটার ইউনিয়ন সড়ক এবং ৫০ কিলোমিটার RCC সড়ক উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়। এর সঙ্গে প্রায় ৪,২৫৩ মিটার সেতু/কালভার্টের কাজও অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রকল্প ব্যয় প্রায় ২,৬৯৩ কোটি টাকা।
বরিশাল–ভোলা–লক্ষ্মীপুর জাতীয় মহাসড়ক উন্নয়নেও প্রায় ৫,০২২ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়।
এই সড়কগুলো কেবল পাকা রাস্তা নয়; এগুলো গ্রাম থেকে উপজেলা, উপজেলা থেকে জেলা এবং জেলা থেকে জাতীয় বাজারে পৌঁছানোর অর্থনৈতিক স্নায়ুতন্ত্র।
কৃষি প্রকল্প উৎপাদন ও জলবায়ু-সহনশীলতার সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছে।
সামাজিক নিরাপত্তা ও আশ্রয়ণ উন্নয়নের সুফলকে নিম্নআয়ের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
এগুলো বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়। এগুলোকে একত্রে দেখলে দক্ষিণবঙ্গের জন্য একটি বৃহৎ ভূ-অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাসের চিত্র ফুটে ওঠে।
শেখ হাসিনার সক্ষমতার প্রশ্নে পদ্মা সেতু কেন প্রতীকী:
পদ্মা সেতুর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক তাৎপর্য নিহিত রয়েছে এর বাস্তবায়নের প্রেক্ষাপটে। দেশের নিজস্ব অর্থায়নে এত বৃহৎ অবকাঠামো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ওপর একটি বড় আস্থার প্রকাশ ছিল।
সেতুটি আজ দৃশ্যমান। তার ওপর দিয়ে প্রতিদিন যানবাহন চলছে; নিচ দিয়ে রেল চলছে। জুন ২০২৪ পর্যন্ত বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের হিসাবে সেতুটি থেকে ১,৬৭২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা টোল আদায় হয়েছে।
তবে পদ্মা সেতুর প্রকৃত মূল্য টোলের অঙ্কে পরিমাপ করা যাবে না। এর মূল্য নিহিত থাকবে আগামী কয়েক দশকে দক্ষিণাঞ্চলের জমিতে নতুন শিল্প কতটা গড়ে ওঠে, মোংলা ও পায়রা কতটা বাণিজ্য বাড়ায়, কৃষকের উৎপাদন কত দ্রুত বাজারে পৌঁছায়, কত নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং দক্ষিণবঙ্গের তরুণরা কতটা নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ পায় তার ওপর।
অর্থাৎ পদ্মা সেতু একটি সমাপ্ত প্রকল্প হলেও এর অর্থনৈতিক জীবন মাত্র শুরু হয়েছে।
উন্নয়নের দ্বিতীয় অধ্যায় এখন দক্ষিণবঙ্গের হাতে:
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা রয়েছে। অবকাঠামো নির্মাণ উন্নয়নের পূর্বশর্ত; কিন্তু অবকাঠামোকে উৎপাদনশীল অর্থনীতিতে রূপান্তর করা তার পরবর্তী চ্যালেঞ্জ।
পদ্মা সেতুর পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শিল্প বিনিয়োগের আগ্রহ বেড়েছে এমন তথ্য বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যেও উঠে এসেছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
এখন প্রয়োজন-
শিল্পায়নকে ত্বরান্বিত করা,
মোংলা ও পায়রা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো,
গ্যাস ও বিদ্যুতের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা,
কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা,
নারী ও যুবকদের দক্ষতা উন্নয়ন করা,
যশোর–খুলনা–বরিশাল–পটুয়াখালীকে প্রযুক্তি ও শিল্পের নেটওয়ার্কে যুক্ত করা,
এবং পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে দক্ষিণবঙ্গের পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক করিডোর নির্মাণ করা।
তাহলেই পদ্মা সেতুর সম্ভাবনা তার পূর্ণ অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পৌঁছাবে।
শেষ কথা:
দক্ষিণবঙ্গের উন্নয়নের ইতিহাসকে যদি একটি বাক্যে ধারণ করতে হয়, তবে বলা যায় ১৯৯৬–২০০১ সালে যে স্বপ্নের অবকাঠামোগত ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল, ২০০৯–২০২৪ সালে তার অনেকটাই রূপ পেয়েছে বৃহৎ জাতীয় উন্নয়ন অবকাঠামোয়।
সেই দীর্ঘ অভিযাত্রার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতীক পদ্মা সেতু।
এটি নদী পারাপারের সেতু, কিন্তু তার চেয়েও বেশি এটি অঞ্চল সংযোগের সেতু।
এটি রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের সেতু, কিন্তু তার চেয়েও বেশি এটি কৃষি ও বাজারের সেতু।
এটি সড়ক ও রেলের সেতু, কিন্তু তার চেয়েও বেশি এটি শিল্প ও বিনিয়োগের সেতু।
এটি বর্তমানের অবকাঠামো, কিন্তু তার চেয়েও বেশি এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সেতু।
মোংলা EPZ, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা বন্দর, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র, ভোলার গ্যাস, যশোরের সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, বরিশাল ও পটুয়াখালীর উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ সড়ক, কৃষি উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, আশ্রয়ণ এবং শতভাগ বিদ্যুতায়ন সবকিছুকে যদি একই উন্নয়ন-মানচিত্রে রাখা হয়, তাহলে পদ্মা সেতুর প্রকৃত তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পদ্মা সেতু তাই কেবল কংক্রিটের স্থাপনা নয়; এটি বাংলাদেশের সক্ষমতার দৃশ্যমান স্বাক্ষর এবং দক্ষিণবঙ্গের নতুন অর্থনৈতিক ভূগোলের কেন্দ্রবিন্দু।
একদিন ইতিহাস হয়তো পদ্মার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই সেতুটিকে শুধু একটি প্রকৌশল বিস্ময় হিসেবে দেখবে না; দেখবে একটি দীর্ঘদিনের প্রান্তিক ভূখণ্ডকে জাতীয় অর্থনীতির মূল স্রোতে যুক্ত করার শেখ হাসিনার এক ঐতিহাসিক প্রয়াস হিসেবে।
আর সেই অর্থে, পদ্মা সেতু দক্ষিণবঙ্গের উন্নয়নের শেষ অধ্যায় নয় এটি নতুন দিগন্তের প্রথম দৃশ্যমান রেখা।
লেখক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন শাহজাদা, উপ-দপ্তর সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ।
