সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নিয়োগ-পদায়ন, বদলি, পদোন্নতি, টেন্ডার ও উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগও রয়েছে।
দুদক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অভিযোগে উল্লেখ করা বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের অঙ্ক যোগ করলে তা প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অভিযোগ চার দেশে মোট ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রমাণিত নয় এবং অনুসন্ধানের মাধ্যমে তা যাচাই করা হবে।
এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছিল দুদক। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি এবং কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ তখন অনুসন্ধানের আওতায় ছিল। নতুন অভিযোগগুলো আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে তদন্তের পরিধি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের একটি অংশে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা লেনদেনের দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের ৩৬ জন জেলা প্রশাসক পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগে উল্লেখিত হিসাব অনুযায়ী, এসব ক্ষেত্রে সম্ভাব্য লেনদেনের পরিমাণ ৭২ কোটি থেকে ৩৬০ কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন টেন্ডারের সঙ্গেও আসিফ মাহমুদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা মুরাদনগরের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং অর্থ গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও অভিযোগে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগের ক্ষেত্রে ১০ কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে। একইভাবে এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে নিয়োগে ৫২ কোটি টাকা এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সিইও হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগে ৬৫ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এর আগের অনুসন্ধানে ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার দায়িত্ব ও পদায়ন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ৭৬ লাখ টাকা, ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতিতে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং পদোন্নতির পর পছন্দের স্থানে পদায়নের জন্য ২ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগের কথা উঠে এসেছিল।
অভিযোগে বিদেশে অর্থপাচারের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ করা হয়েছে। চার দেশে মোট ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের এই অভিযোগের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে সম্পদ কেনা ও ব্যবসায় বিনিয়োগের দাবিও রয়েছে।
অভিযোগে পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ রাখার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। আসিফ মাহমুদের দুই বোনের স্বামী ও এক ভাগ্নের মাধ্যমে বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগও করা হয়েছে।
আসিফ মাহমুদের বাবা বিল্লাল হোসেন, এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন এবং পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার, ঘুষের লেনদেনে সহযোগিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে হেলিকপ্টারে কম্বল বিতরণের মাধ্যমে সরকারি অর্থ অপচয় এবং বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় গুলিসহ ব্যাগ নিয়ে প্রবেশের ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, গাড়ি ব্যবহার ও পাঁচ তারকা হোটেলে যাতায়াতের বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
দুদক জানিয়েছে, এসব অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানের মাধ্যমেই যাচাই করা হবে। নতুন অভিযোগে একাধিক মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন প্রকল্প, নিয়োগ-পদায়ন এবং বিদেশে অর্থপাচারের বিষয় একসঙ্গে থাকায় অনুসন্ধানটি আগের তুলনায় বড় পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে।
ন্যাশনিক্স/এলকে
