দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে ব্যাংক থেকে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকা ঋণের প্রায় ৩৩ টাকাই খেলাপি হয়ে পড়েছে। এর ফলে খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষে উঠে এসেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের পর খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে চাদ, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, আলজেরিয়া ও ঘানা। এর আগে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণের হার ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনে।
তবে এই পরিস্থিতি মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে কতটা বদলে গেছে, সেটিই এখন বড় উদ্বেগের বিষয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও বর্তমানের মতো মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি হওয়ার পরিস্থিতি ছিল না। ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। এর দুই বছরের মধ্যেই খেলাপি ঋণের হার নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ব্যাংক খাতের এই দ্রুত অবনতির পেছনে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঋণ সুবিধা, দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা এবং বিভিন্ন সময়ে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগসহ নানা কারণকে দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা ও কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতাও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণের এই ঊর্ধ্বগতি শুধু ব্যাংকিং খাতের সমস্যা নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি। বিপুল পরিমাণ ঋণ অনাদায়ী হয়ে পড়লে ব্যাংকের মূলধন ও তারল্যের ওপর চাপ বাড়ে। এর প্রভাব নতুন ঋণ বিতরণ, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও পড়তে পারে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রকৃত খেলাপিদের কাছ থেকে ঋণ আদায়, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের এমন বিস্ফোরণ দেশের ব্যাংকিং খাতের গভীর সংকটকেই সামনে নিয়ে এসেছে। এখন এই সংকট মোকাবিলায় কার্যকর সংস্কার ও ঋণ আদায়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ কত দ্রুত নেওয়া যায়, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
