ক্ষমতায় আসার ছয় মাস পূর্ণ করল বিএনপি সরকার। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আজ ১৭ আগস্ট ছয় মাস পূর্ণ হলো। কিন্তু ছয় মাসের এই পথচলায় সরকারের সাফল্যের পাশাপাশি গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, মূল্যবৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যানেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা ও মব সহিংসতার উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে দেশের জ্বালানি খাত। গত কয়েক মাসে গ্যাসের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। জুলাইয়ে একটি LNG টার্মিনালে কারিগরি সমস্যার পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, CNG স্টেশন থেকে শুরু করে বাসাবাড়ির রান্নাঘরেও
একপর্যায়ে দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ঘনফুট থাকলেও সরবরাহ নেমে যায় ২.১৫ বিলিয়ন ঘনফুটের নিচে। ফলে গ্যাসের চাপ কমে যায়, অনেক CNG স্টেশনে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয় এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়ে।
গ্যাস সংকট সামাল দিতে সরকারকে নতুন শিল্পকারখানায় গ্যাস সংযোগ আপাতত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তও নিতে হয়েছে। জ্বালানি বিভাগের চিঠিতে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ক্রমাগত কমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতেও স্বস্তি ফেরেনি। গ্যাস ও জ্বালানির সংকটের কারণে বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। এমনকি বিএনপির পক্ষ থেকেও জুলাইয়ে লোডশেডিং ও জ্বালানি খাতে মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।
জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বেড়েছে। এপ্রিল ও মে-জুনে দফায় দফায় জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়। বর্তমানে ডিজেল প্রতি লিটার ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
তবে ছয় মাসের মূল্যায়নে সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রশ্ন উঠেছে আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে। Human Rights Support Society-এর জানুয়ারি-জুন ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছয় মাসে দেশে ৮৩০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫৬ জন নিহত এবং ৫,২৪৬ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ২৬১টি মব সহিংসতার ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত এবং ২৫৬ জন আহত হয়েছেন।
আর Odhikar-এর এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে তিন মাসে মব হামলায় ৩৩ জন নিহত এবং রাজনৈতিক সহিংসতায় ৪১ জন নিহত ও ৯৭০ জন আহত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থার সংকটের কথাও বলা হয়েছে।
রাজনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার, মামলা, আটক এবং রাজনৈতিকভাবে হয়রানির অভিযোগও অব্যাহত রয়েছে। Human Rights Watch-এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শত শত আওয়ামী লীগ নেতা, সদস্য ও সমর্থক বিভিন্ন মামলায় আটক রয়েছেন এবং অনেকেই বিচার শুরুর আগেই দীর্ঘ সময় কারাগারে আছেন।
গুমের বিষয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। Human Rights Watch জুলাই ২০২৬-এ জানিয়েছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রথমবারের মতো একটি নতুন অভিযোগিত enforced disappearance বা জোরপূর্বক গুমের ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি আগের সরকারের আমলের গুমের বিচার ও জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছে।
