দেশে তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আবাসিক গ্রাহকদের ওপর এর প্রভাব পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জ্বালানি খাতে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ ও অর্জন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ২০০৮ সালের তুলনায় পরবর্তী সময়ে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার, নতুন কূপ খনন এবং LNG আমদানির অবকাঠামো তৈরির বিষয়গুলো সামনে এসেছে।
তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দেশে মোট গ্যাস উৎপাদন ছিল প্রায় ৬০০.৮৬ বিলিয়ন ঘনফুট (BCF), যা দৈনিক গড়ে প্রায় ১ হাজার ৬৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট (MMCFD)। ২০০৮ সালের সময়ে জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ ছিল আনুমানিক ১ হাজার ৭০০ MMCFD-এর কাছাকাছি। আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন এবং বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশের বার্ষিক গ্যাস উৎপাদন বেড়ে প্রায় ৯৭১.৬ BCF-এ পৌঁছায়, যা ২০০৭-০৮ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৬২ শতাংশ বেশি।
গ্যাস উৎপাদনের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মাইলফলক আসে ২০১৫ সালে। সরকারি জ্বালানি-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ৬ মে ২০১৫ সালে দেশের দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ২ হাজার ৭৮৫.৮ MMCFD-এ পৌঁছায়, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দৈনিক গ্যাস উৎপাদনের রেকর্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ ২০০৮ সালের প্রায় ১ হাজার ৭০০ MMCFD সরবরাহের তুলনায় সর্বোচ্চ উৎপাদনের সময় দৈনিক সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় ৬৪ শতাংশ বেশি ছিল।
এই সময় দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সুন্দলপুর, শ্রীকাইল, রূপগঞ্জ, ভোলা নর্থ, জকিগঞ্জ ও ইলিশাসহ বেশ কয়েকটি নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। এর মধ্যে ভোলা ও ইলিশার গ্যাস আবিষ্কার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। ২০২৩ সালে ইলিশা-১ কূপে গ্যাস পাওয়ার পর এটিকে দেশের ২৯তম গ্যাসক্ষেত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। একই সময়ে শুধু নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার নয়, তিতাস, বাখরাবাদ, শ্রীকাইল, ভোলা, কৈলাসটিলাসহ বিভিন্ন এলাকায় নতুন কূপ খনন ও পুরোনো কূপ উন্নয়নের কাজও চালানো হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের জ্বালানি খাতের আরেকটি বড় উদ্যোগ ছিল LNG আমদানি। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবিলায় LNG আমদানি এবং তা জাতীয় গ্যাস গ্রিডে যুক্ত করার জন্য অবকাঠামো তৈরি করা হয়। বর্তমানে দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় এই LNG অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তবে সময়ের সঙ্গে দেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় বর্তমানে আবারও বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৪ হাজার MMCFD হলেও সরবরাহ প্রায় ২ হাজার ৪২৫ MMCFD-এর আশপাশে রয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ প্রায় ১ হাজার ৬১৫ MMCFD। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে প্রতিদিন বড় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে কয়েক বছর আগের তুলনায় দেশীয় গ্যাস উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে যাওয়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তাই দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন, পুরোনো কূপের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সমুদ্রভাগে অনুসন্ধান জোরদার করা জরুরি। শুধু LNG আমদানির ওপর নির্ভর করে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
বর্তমান তীব্র গ্যাস সংকটের সময়ে তাই ২০০৮ সালের পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমানের তুলনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দেশের বার্ষিক গ্যাস উৎপাদন ছিল ৬০০.৮৬ BCF, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তা প্রায় ৯৭১.৬ BCF পর্যন্ত উন্নীত হয়েছিল এবং ২০১৫ সালে দৈনিক উৎপাদন ২ হাজার ৭৮৫.৮ MMCFD-এর রেকর্ড স্পর্শ করেছিল। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার, কূপ খনন এবং LNG অবকাঠামো তৈরির এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে।
