৫০০ কোটি ডলার কেলেঙ্কারির অভিযোগ—বাস্তবে নেই কোনো ভিত্তি

অবশ্যই পরুন

দেশের বৃহত্তম অবকাঠামো প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ঘিরে ‘৫০০ কোটি ডলার আত্মসাৎ’-এর অভিযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে। তবে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ও সরকারি সূত্রগুলো এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলেই দাবি করছে।

অভিযোগের সূত্রপাত

২০২৪ সালের মার্চ-এপ্রিলের দিকে এই অভিযোগটি জোরালোভাবে সামনে আসে। বিশেষ করে ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক-কে ঘিরে বিভিন্ন দাবি ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ করা হয়, তিনি রূপপুর প্রকল্প থেকে কমিশন নিয়ে যুক্তরাজ্যে সম্পদ গড়েছেন। বিষয়টি কিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও আসে এবং পরে তা রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নেয়।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য নথি, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য বা আন্তর্জাতিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।

নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের অবস্থান

রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান Rosatom State Atomic Energy Corporation। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালের এপ্রিলে এক বিবৃতিতে জানায়, প্রকল্পে কোনো ধরনের অনিয়ম বা কমিশন লেনদেনের ঘটনা ঘটেনি।

বাংলাদেশে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার মান্তিৎস্কি-ও একই সময়ে অভিযোগগুলোকে “সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে মন্তব্য করেন।

চুক্তির ধরন ও অর্থায়ন

রূপপুর প্রকল্পটি সরকার-থেকে-সরকার (G2G) চুক্তির আওতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত এই চুক্তি অনুযায়ী:

মোট ব্যয়: ১২.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার

রাশিয়ার ঋণ সহায়তা: প্রায় ৯০%

নির্মাণকারী: Rosatom

উৎপাদন ক্ষমতা: ২,৪০০ মেগাওয়াট

এই কাঠামোতে কোনো মধ্যস্থতাকারী বা ব্যক্তিগত এজেন্টের ভূমিকা নেই। অর্থ সরাসরি রাষ্ট্রীয় চ্যানেলের মাধ্যমে লেনদেন হয়, ফলে ব্যক্তিগত কমিশনের সুযোগ সীমিত বলেই সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।

৫০০ কোটি ডলার’—সংখ্যার উৎস কোথায়?

অভিযোগে উল্লেখিত ৫০০ কোটি ডলারের কোনো নির্দিষ্ট উৎস বা হিসাব পাওয়া যায়নি। এ ধরনের দাবি সমর্থন করে এমন কোনো সরকারি নথি, তদন্ত প্রতিবেদন বা আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যবেক্ষণও সামনে আসেনি।

টিউলিপ সিদ্দিক প্রসঙ্গ

টিউলিপ সিদ্দিক-এর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোও পরে তদন্তে টেকেনি। যুক্তরাজ্যের সংসদীয় স্ট্যান্ডার্ডস কমিটি ২০২৪ সালের জুনে তাকে কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত না পাওয়ার কথা জানায়। তার সম্পদ সংক্রান্ত তথ্যও দেশটির আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত ও পর্যবেক্ষণাধীন।

আন্তর্জাতিক নজরদারি

রূপপুর প্রকল্পটি International Atomic Energy Agency (IAEA)-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর আওতায় নিয়মিত মনিটরিং করা হয়। এ ধরনের বড় অঙ্কের দুর্নীতি হলে তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচিত হওয়ার কথা—তবে এমন কোনো তথ্য এখনো প্রকাশ পায়নি।

উপসংহার

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। তবে প্রকল্পটি ঘিরে ওঠা বড় অঙ্কের দুর্নীতির অভিযোগ এখন পর্যন্ত প্রমাণিত নয় বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো জানিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও প্রমাণ অপরিহার্য। প্রমাণ ছাড়া বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের দাবি জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।

লেখক: জয়দেব নন্দী প্রচার সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ

আরও নিবন্ধ

সর্বশেষ সংবাদ