“একমাত্র প্রকাশ্য ক্ষমার মাধ্যমেই আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে ফেরা প্রাসঙ্গিক হতে পারে?”
ইদানিং একটা বিষয় খুব জোরেসোরে শোনা যাচ্ছে, রাজনীতিতে ফিরতে হলে আওয়ামীলীগের ক্ষমা চাওয়ার বিকল্প নেই। ভালো আওয়ামীলীগ কিংবা খারাপ আওয়ামীলীগ – একটি লাইন অফ ডিমার্কেশন এখানে টেনে দেওয়া হচ্ছে৷ এটি ওয়ান ইলেভেনের মত একটি মাইনাস ফর্মুলা যেখানে মুজিববাদী আদর্শ থেকে সরে এসে নখদন্তহীন ভিন্ন আওয়ামীলীগকে তৈরী করার অপপ্রয়াস। সেদিনও সাবেক আওয়ামীলীগার এবং বর্তমানে বিএনপি নেতা ফজলুর রহমান টকশোতে বলছিলেন, “তোমার নেত্রী মাফ চায়না কেন?”
৯ আগস্ট বস্ত্র ও পাট উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন বলে ফেলেছিলেন, আওয়ামীলীগের সবাই তো খারাপ নয়। ভালোদের নিয়ে পুনর্বাসন করে রাজনীতি করা যেতে পারে।
ড. ইউনুসও ভালো আওয়ামীলীগার দের ক্ষমা চেয়ে রাজনীতিতে আসার সুযোগ রয়েছে বলে গত বছর বলেছিলেন।
আওয়ামীলীগের ক্ষমা চাইতে হবে কোন শর্তে? জুলাই আন্দোলন কোন মীমাংসিত সত্য নয়। এর কোন কনক্লুসিভ এভিডেন্স নেই। এটি আওয়ামীলীগ সরকার বনাম পশ্চিমা ডিপস্টেটের সাইকোলোজিক্যাল ওয়ারফেয়ার থেকে হঠাত সিভিল ওয়ারে মোড় নেওয়া একটি পরিস্থিতি। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান অস্ট্রিয়ান ভলকার টুর্ক যখন এই ব্যপারে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে বিরত থাকার উপদেশ দেন, যখন ডিপ্সটেটের এজেন্ট জর্জ সরোস এবং তার ছেলের ইউনুসের সাথে আদিখ্যেতা পূর্বেই আলোচিত এবং তাদের বাংলাদেশ সফর এখানে ডিপস্টেটের প্রত্যক্ষ মদদের দৃষ্টান্ত দেয়৷ জাতিসংঘের ২৮ মিলিয়ন ডলার ডোনেশনের কেচ্ছা ফাস হয়ে যায় বা ইউনুস জাতিসংঘের সাইডলাইন করিডোরে নিজেই বলেন, এটি মেটিকুল্যাস কিংবা নিখুত পরিকল্পনার অংশ- তখন এটিকে বিপ্লব বলার কোন শর্তই থাকেনা। বিপ্লব/ অভ্যুত্থান আর কালার রেভ্যুলেশনের পার্থক্য যোজন যোজন। বিপ্লব বা অভ্যুত্থান পুর্ববর্তী কোন পরিকল্পনার অংশ নয়, বরং হঠাত ঘটে যাওয়া কোন ঘটনা। যারা আন্দোলন করেছে, তাদের মুখ:নিসৃত বাণী থেকে এটি প্রতীয়মান, এই আন্দোলন পুর্বেই পরিকল্পিত এবং সরকার পতন না হলে তারা সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত থাকতেন। আর প্রচলিত রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বদলে নতুন ব্যবস্থা প্রণয়ণ বিপ্লবের অন্যতম শর্ত। যেমন: সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা থেকে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত নেওয়া। কিংবা পরোক্ষ গণতন্ত্র থেকে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের দিকে ধাবিত হওয়া। শুধু সংস্কার কমিশন গঠনের নামে কালবিলম্ব করাকে বিপ্লব আখ্যা দেওয়া হয়না।
পলিটিক্স পয়েন্ট অফ নো রিটার্নের জায়গা। বাংলাদেশের কোন রাজনৈতিক দলই তাদের সিদ্ধান্তের জন্য প্রকাশ্যে কোন সমালোচনার জায়গা রাখেনি, ক্ষমার দৃষ্টান্ত দেখায়নি।
১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধে প্রকাশ্য বিরোধিতা এবং পাকিস্তানি সামরিক জান্তাকে সহায়তা করার জন্য জামায়াতে ইসলামী এখনো ক্ষমা চায়নি।
বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যার পর সংবিধান লংঘন করে আইয়ুব খানের মত একই সাথে প্রধান সামরিক শাসক ও রাষ্ট্রপতি হয়ে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় নীতির যেই ডিসটরশন করেছেন, তার জন্য ক্ষমা চাননি জীবদ্দশায়। কর্নেল তাহেরকে ফাসি দেবার জন্য ক্ষমা চাননি। নথিভুক্ত ১১৪৩ জন সামরিক অফিসারকে ফা।সি দেবার জন্য ক্ষমা চাননি। এগুলো কনক্রিট এবং একই সাথে কনক্লুসিভ এভিডেন্স।
এরশাদ ক্ষমা চাননি জিয়ার মতই অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের জন্য৷ ক্ষমা চাননি ৯০ এর গণ অভ্যুত্থানে মানুষের উপর কামানের গোলা নিক্ষেপ করে গণহত্যার জন্য। ক্ষমা চায়নি বিকেন্দ্রীভুত করণের মাধ্যমে বিচার বিভাগে অনাকাঙ্খিত হস্তক্ষেপের জন্য।
খালেদা জিয়া, তারেক জিয়া ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে একটি রাজনৈতিক দলকে সম্পুর্ণভাবে বিলুপ্ত করার চেষ্টা করলেও ক্ষমা চাননি। হাসপাতালের গেইট বন্ধ করে তাদের চিকিৎসার মৌলিক অধিকার বঞ্চিত করার জন্য ক্ষমা চাননি। ওয়ান ইলেভেনের মূল দায় তৎকালীন বিএনপি সরকারের উপর বর্তায়। প্রজ্ঞাপনে বিচারপতির অবসরের মেয়াদ ৬৫ থেকে ৬৭ করে নিজস্ব তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান বসিয়ে ওয়ান ইলেভেন ত্বরান্বিত করার জন্য বিএনপি ক্ষমা চায়নি। গণতন্ত্রকে কলুষিত করে নিজেরা সহ সব রাজনৈতিক দলকে সামরিক শাসনের বলয়ে আবদ্ধ করার জন্য তারা মাফ চায়নি। ৬৩ জেলায় এক যোগে বোমা হামলার দায় সরকার প্রধান হিসেবে বিএনপির দিকে যায়। তারা ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। উই আর লুকিং ফর শত্রুজ ইজ নট এ প্রপার স্টেটমেন্ট। ১০ ট্রাক অস্ত্র দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশকে অস্থিতিশীল করার মত হীন প্রচেষ্টার জন্য ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল বৈকি।
জামায়াত মৌলবাদী গোষ্ঠীর উত্থানে সম্পুর্নভাবে দায়ী। এ ব্যাপারে তারা “No regression ” পন্থা অবলম্বন করেছে।
যখন বলা হয়, এই ইন্টেরিম সরকার জনগণের ইচ্ছায় গঠিত হয়েছে, তখন প্রশ্ন আসে কত শতাংশ জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে তারা ক্ষমতায় আসল? এ ব্যপারে কোন সমীক্ষা নেই। কারা ইউনুসকে ৫ বছর ক্ষমতায় দেখতে চায়, সংস্কার চায়-সে ব্যপারে কোন গণভোট আয়োজনের নমুনা নেই। বিদেশী সংস্থার মদদে তাদের অন্যায় ভাবে ক্ষমতা দখলের জন্য ক্ষমা চাওয়া অধিক যৌক্তিক বলে বিবেচ্য হওয়া উচিত।
মীমাংসিত সত্যের কনক্লুসিভ এভিডেন্স থাকে। কথিত জুলাই শহীদদের মৃত্যুগুলো রহস্যময়, মীমাংসিত নয়। জাতিসংঘ ১৪০০ জন জুলাইয়ে নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে। সেই তারিখ ১৫ আগস্ট পর্যন্ত। ৫ আগস্টের পর আওয়ামীলীগ ক্রান্তিকালীন তাগিদে কার্যত অচল সংগঠন। সেখানে ১৪০০ জন নিহত হবার কথা বলা আছে।
জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের নিহত তালিকা ও ইন্টেরিম সরকারের শহীদের তালিকায় নামের গড়মিল রয়েছে। সংখ্যায়ও দুটি সমমনা সংগঠন একই মতানৈক্যে আসতে পারেনি। জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন তাও ৮২০ এর এদিক সেদিক বলে গা বাচিয়েছে, মন্ত্রনালয়ের গেজেট থেকে প্রকাশিত তালিকায় সংশোধনী সহ ৮৩৬ জনের নাম উল্লিখিত। সেটা ৫ আগস্ট পর্যন্ত। জাতিসংঘের ১৪০০ জনের সাথে তাদের হিসাব মেলেনি। কারন জাতিসংঘের তালিকা ১৫ আগস্ট পর্যন্ত করা। বাকীগুলো ৫ আগস্ট।
৫ আগস্ট থেকে আওয়ামীলীগ কার্যত নিষ্ক্রিয় সংগঠন। সেদিন থেকে আওয়ামী নেতাকর্মী নিধনের যেসব ভাইরাল ফুটেজ দেখা গেল, তাতে প্রতীয়মান, ৬-১৫ আগস্ট এই ১০ দিনে নিহত ৬০০ মানুষ আরোহ অনুমানে আওয়ামীলীগের, এবং অবরোহ অনুমানের বাইরে এটি সর্বতসিদ্ধ নিরপেক্ষ। ৬-১৫ আগস্ট ৬০০ এর অধিক মানুষকে মব করে মেরে ফেলার জন্য ইউনুস সরকার ক্ষমা চেয়েছে? মব বর্তমানেও চলমান এবং আলোচিত ইস্যু। এমন হিংস্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে কস্মিনকালেও ঘটেনি।
আকারগত সত্যতা কিংবা বস্তুগত সত্যতার নিরিখে জুলাইয়ে নিহত হওয়া আন্দোলনকারীদের দমানো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীন সার্বভৌমত্বের পরিচায়ক, তবুও সেখানে কো ল্যাটারাল ড্যামেজ ও বিদেশী শক্তির অবস্থান পুর্বেই পরিষ্কার করা গেছে। তাই বলা হয়েছে, জুলাই আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা কোন মীমাংসিত সত্য নয়।
আওয়ামীলীগের ক্ষমা চাওয়া উচিত অন্য কারনে। পদ্মাসেতু, মেট্রোরেল, শতভাগ বিদ্যুতের জন্য। সবার হাতে ডিজিটাল ডিভাইস সহজলভ্য করার জন্য, রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো উন্নয়ন করার জন্য, জিডিপি ৫০ বিলিয়ন থেকে ৪৬২ বিলিয়নে নিয়ে যাবার জন্য। ছোট ও মাঝারি শিল্পের মাধ্যমে মানুষকে ভাত রুটির ব্যবস্থা করে দেবার জন্য, গ্লোবালাইজেশনের হাব তৈরী করে দেবার জন্য, আইন শৃংখলা ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী উন্নতিকরণের জন্য। বিদেশী ষড়যন্ত্রে দেশকে বিক্রি না করার জন্য আওয়ামীলীগ হাজার ফুলের মালা উপহার পেতে পারে। ক্ষমা চাইবে তারা, যারা এই কালার রেভ্যুলেশনে গৃহযুদ্ধের স্ফুলিঙ্গ সূচনা করল।
আওয়ামীলীগ জনগণের ভরসার প্রতীক হয়েই ফিরবে। ভাত, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার জন্য ফিরবে৷ আওয়ামীলীগ লাল গালিচা চায়নি, একসাথে সকলকে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছে। বারবার ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে গড়ে তোলা আওয়ামীলীগের নির্মোহ দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। বারবার দেশের মানচিত্র রক্ষা করাই আওয়ামীলীগের ভাগ্যের নিয়তি। এই ভাগ্য সবার হয়না এটাও সত্য।
ইন্টেরিমের কথা শুনে ডিপস্টেট হাসে,
কই তাহার মত তুমি ইউনুসকে ৫ বছর চাহ না তো!
