বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় এসেছে, একটি বিশেষ মহলের প্রধান অস্ত্র ছিল ‘দেশ বিক্রি করে দিচ্ছে’ নামক নির্জলা প্রোপাগান্ডা। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ ও ‘কালার রেভোলিউশন’-এর মাধ্যমে পরিকল্পিত উপায়ে ক্ষমতার পটপরিবর্তন, ড. ইউনূসের অসাংবিধানিক ক্ষমতা দখল এবং ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একতরফা সাজানো ও প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামো আজ দেশবাসীর সামনে প্রকৃত সত্য উন্মোচন করে দিয়েছে। বিশেষ করে বর্তমানে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার এবং সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে থাকা জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান দেশের সার্বভৌমত্বকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষা কূটনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২২ সালের মার্চে মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি অফ স্টেট ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ডের ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশ এক কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিল। সে সময় মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে জিএসওএমআইএ (GSOMIA) এবং আকসা (ACSA) নামক দুটি সংবেদনশীল প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করার জন্য তীব্র চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু-কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও দৃঢ়তার সাথে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, জিএসওএমআইএ চুক্তিতে সই করলে বাংলাদেশের সংবেদনশীল সামরিক ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বাধ্যতামূলক হতো এবং বাংলাদেশের সার্বভৌম ভূখণ্ড ব্যবহার করে অন্য কোনো দেশ তৃতীয় কোনো দেশে সামরিক অভিযান চালানোর সুযোগ পেত। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকাকালীন এই ঝুঁকি নেননি, যা মূলত দেশের সামরিক গোপনীয়তা এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে সুনিশ্চিত করেছিল।
৯ ফেব্রুয়ারির গোপন চুক্তি ও রাজনৈতিক সমঝোতা
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত একতরফা সাজানো ও প্রহসনের নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে, অর্থাৎ ৯ ফেব্রুয়ারি ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অসাংবিধানিক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি বিশেষ গোপন বাণিজ্যিক ও কৌশলগত চুক্তি সম্পন্ন করে। এই চুক্তির স্বচ্ছতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু থেকেই জনমনে নানা সংশয় ছিল। অবৈধ ইউনূস সরকার প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে তথাকথিত বিজয়ী সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতে শুরু করেছে যে, ৯ ফেব্রুয়ারির সেই গোপন চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ কীভাবে বিকিয়ে দেওয়া হয়েছে।
৪ মার্চ ২০২৬, সাজানো প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান (যিনি সাবেক অবৈধ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন) এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। তার ভাষ্যমতে, ৯ ফেব্রুয়ারির সেই গোপন বাণিজ্য চুক্তিতে তৎকালীন প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি—বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী—উভয় দলেরই সুনির্দিষ্ট ও নীতিগত সম্মতি ছিল। যারা এখন বর্তমান সংসদের যথাক্রমে সরকারি দল এবং প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আসীন।
অর্জনের রাজনীতি বনাম ক্ষমতার সমীকরণ
আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। ছিটমহল বিনিময় ও সমুদ্রসীমা জয়ের মাধ্যমে দেশের মানচিত্র বড় করা থেকে শুরু করে আদানির বিদ্যুৎ চুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট। ক্ষমতা দখলের দীর্ঘ ১৮ মাসে অবৈধ ইউনূস সরকার কিংবা সাজানো ও প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে বিজয়ী আজকের তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারও আদানির সেই সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ নিতে বাধ্য হচ্ছে, যা শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের এক অনন্য প্রমাণ।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও পল কাপুরের ঢাকা সফর
৩ মার্চ ২০২৬, রাত ১০টায় মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর দিল্লি হয়ে ঢাকায় পৌঁছেছেন। তার এই সফরের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হলো জিএসওএমআইএ চুক্তির চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতি আদায় করা। বর্তমান প্রশাসনের ‘নতিস্বীকারের কূটনৈতিক নীতি’ এবং ৯ ফেব্রুয়ারির চুক্তিতে সংসদে থাকা সরকারি ও বিরোধী দল উভয়ের পূর্ব-সম্মতির বিষয়টি এখন স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বাংলাদেশ তার দীর্ঘদিনের অনড় ও স্বাধীন প্রতিরক্ষা অবস্থান থেকে বিচ্যুত হচ্ছে।
সময় আজ প্রমাণ করে দিচ্ছে কারা আসলে দেশের সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী ছিল। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকার ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির মাধ্যমে পরাশক্তিগুলোর চাপের মুখে লড়াই করে দেশের স্বার্থ রক্ষা করেছিলেন। বিপরীতে, সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান শাসক গোষ্ঠী ও নামমাত্র বিরোধী দল শুরুতেই যে আপস ও নতিস্বীকারের পথ বেছে নিয়েছে, তা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লেখক – আকিব হোসেন জাবির
শিক্ষার্থী – আইন বিভাগ, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।
