সাবেক এনএসআই কর্মকর্তা আমিনুল হক পলাশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক দীর্ঘ পোস্টে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও চাকরিচ্যুতির প্রেক্ষাপট বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে ইস্যুকৃত অভিযোগনামায় তাঁর বিরুদ্ধে চারটি মূল অভিযোগ আনা হয়—ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর প্রতিষ্ঠানসমূহের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা ও দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকা; ইউনূস ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত আয়কর মামলাসমূহ নিষ্পত্তির মাধ্যমে রাজস্ব আদায় কার্যক্রমে অংশ নিয়ে এখতিয়ার বহির্ভূত কাজ করা; এনএসআইতে কর্মরত অবস্থায় ইউনূস ও তাঁর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম সংক্রান্ত তদন্তে বিধিবহির্ভূত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অংশগ্রহণ; এবং তাঁর বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে দুদকের অনুসন্ধান, শ্রম আদালতের মামলা তদারকি ও আয়কর মামলার নিষ্পত্তিতে সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই তাঁকে প্রথমে সাময়িক বরখাস্ত এবং পরে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আমিনুল হক পলাশ দাবি করেন, চাকরিকালীন সময়ে তিনি কখনো পেশাগত বিষয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেননি। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে বিষয়টি জনসমক্ষে আসায় নিজের অবস্থান পরিষ্কার করা প্রয়োজন মনে করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ড. ইউনূস ও তাঁর প্রতিষ্ঠানসমূহের আয়কর মামলাসমূহ আইনগত প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তির মাধ্যমে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত প্রায় ২৩৮ কোটি টাকা অনাদায়ী কর আদায় হয়। নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বাকি মামলাগুলো চললে আরও প্রায় ২০০০ কোটি টাকা আদায় সম্ভব হতো বলে তিনি দাবি করেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ক্ষমতা গ্রহণের পর গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকার কর প্রদানের রায় বাতিল করা হয় এবং ধাপে ধাপে অন্যান্য আয়কর মামলা, শ্রম আদালতের সাজা ও দুদকের মামলাও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই প্রত্যাহার বা বাতিল করা হয়েছে।
তাঁর মতে, এসব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল না, কারণ আয়কর মামলা এক দশকেরও বেশি সময় আদালতে চলেছে, শ্রম মামলা দায়ের করেছে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর শ্রমিকদের আবেদনের ভিত্তিতে এবং দুদকের মামলা হয়েছে শ্রমিকদের লভ্যাংশ সংক্রান্ত অভিযোগে। তিনি দাবি করেন, ইউনূস সব পর্যায়ে আইনি সুযোগ গ্রহণ করেছেন এবং মামলাগুলো দীর্ঘ সময় বিচারাধীন ছিল। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হলে এত দীর্ঘ সময় ধরে বিচারপ্রক্রিয়া চলত না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এনএসআইয়ের এখতিয়ার প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭২ সালের প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে পরিচালিত সংস্থাটি জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাজ করতে পারে এবং রাষ্ট্রের পাওনা কর আদায় জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ছিল তাঁর পেশাগত দায়িত্বের অংশ এবং সে কারণেই তাঁর অফিসিয়াল গোপনীয় প্রতিবেদনে এসব কাজের উল্লেখ ছিল।
নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, তদন্তকালীন সময়ে তিনি কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি; তবে পরবর্তীতে মামলাসমূহ ও সংশ্লিষ্ট তথ্য দ্রুত প্রত্যাহার বা বাতিল হওয়ায় জনগণের জানার স্বার্থে বিষয়টি সামনে এনেছেন। এ সিদ্ধান্তের জন্য তাঁর কোনো অনুশোচনা নেই বলেও উল্লেখ করেন। সমালোচনার জবাবে তিনি জানান, তিনি নটরডেম কলেজ, ঢাকা থেকে এইচএসসি এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস এবং হানকুক ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি ও কোর্স সম্পন্ন করেছেন। তাঁর দাবি, বিদেশে স্থায়ী হওয়া লক্ষ্য হলে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই তা সম্ভব ছিল; বরং ইউনূসের কথিত অপশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে তিনি ও তাঁর পরিবার ঝুঁকির মুখে পড়েছেন। তিনি মনে করেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগনামা আসলে তাঁর দশ বছরের চাকরি জীবনে রাষ্ট্রীয় ও জনস্বার্থে কাজ করারই একটি দলিল, এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজনে আরও তথ্য সামনে আনতে বাধ্য হতে পারেন।
