নারায়ণগঞ্জ, ১ অক্টোবর — সরকারি মালিকানাধীন যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ফতুল্লা ডিপো থেকে দুই দফায় মিলিয়ে প্রায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার লিটার ডিজেল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার বিস্তারিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে: তেলের পরিমাণ বাস্তবে ডিপোতে থাকা সত্ত্বেও ট্যাংকের সক্ষমতা ও পরিমাপ পদ্ধতিতে করা জালিয়াতির মাধ্যমে বাইরে বিক্রি করা হয়েছে বলে ডিপো ও কোম্পানির সূত্রে জানা গেছে।
যমুনা অয়েল ও ফতুল্লা ডিপো সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ধরনের চুরির পেছনে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে ট্যাংকের মাপ-ক্ষমতা নিয়ে ছলনার স্বীকৃত কৌশল। ফতুল্লা ডিপোর ২২ ও ২৩ নম্বর ট্যাংকে সরাসরি পাইপলাইন থেকে তেল আসার কথা। ২২ নম্বর ট্যাংকটি পুরোনো; ২৩ নম্বরটি নতুন হলেও দুটিরই সক্ষমতা সনদে জালিয়াতি করে মজুত ক্ষমতা কম দেখানো হয়েছে—ফলত: মাপলে তেলের পরিমাণ কম ধরা পড়ে।
ডিপোতে তেল পরিমাপ করা হয় প্রচলিত কৌশলে — একটি ডিপ স্টিক বা রড ব্যবহার করে ট্যাংকের গভীরতা মাপা হয় এবং সেই গভীরতার ওপর ভিত্তি করে লিটার নির্ধারণ করা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মাত্র ২ মিলিমিটার ভুল হলে প্রতিবার প্রায় ১,১৮০ লিটার পর্যন্ত তেল “অবহেলিত” ভাবেই বাইরে নেওয়া সম্ভব। ফতুল্লার দুই ডিপোতে ট্যাংকের সক্ষমতা আগেই বাড়তি দেখানোর ফলে গভীরতার মাপে আসা হিসাব কম হয়ে যাচ্ছে — আসলে তেল ট্যাংকের ভিতরই থাকলেও পরিমাপে কম ধরা পড়ে।
ট্যাংকের সক্ষমতা যাচাই (ক্যালিব্রেশন) এবং সনদ প্রদানের দায়িত্ব বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) বাস্তবায়ন করে। এরপর নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে পুনরায় যাচাই করে নবায়ন করা হয়। তবে বাস্তবে ক্যালিব্রেশন-সংক্রান্ত কাজগুলো কিছু বেসরকারি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান দিয়ে করানো হয়, এবং ফতুল্লা ডিপোর ২২ ও ২৩ নম্বর ট্যাঙ্কের সক্ষমতা যাচাইয়ের কাজটি করা হয় খুলনার ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স এস এম নুরুল হকের মাধ্যমে — সূত্রটি বলছে, ২২ নম্বর ট্যাংকের ক্ষেত্রে সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে ২০১৮ ও ২০২৫ সালে।
প্রাপ্ত তিনটি সক্ষমতা প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২২ নম্বর ট্যাংকের ২০১৮ সালের ক্যালিব্রেশন অনুসারে ২ হাজার মিটার গভীরতায় ধারণক্ষমতা ছিল ১২,৮৮,০৪৪ লিটার। কিন্তু ২০২৫ সালের প্রতিবেদন বলছে একই গভীরতায় ধারণক্ষমতা ১২,২৮,৮৪০ লিটার — অর্থাৎ প্রায় ৫৮–৫৯ হাজার লিটার ক্ষমতা কম দেখানো হয়েছে। ২৩ নম্বর ট্যাংক নতুন হওয়ায় তার তুলনামূলক রিপোর্ট পাওয়া যায়নি।
এছাড়া সূত্রগুলো আরও জানান, ট্যাংকের সক্ষমতা কাগজে কম দেখালেই, তেল ঢোকার আগেই বা পরে ক্যালিব্রেশন হিসাব অনুযায়ী পরিমাপ করলে ভ্রান্তভাবে কম লিটার রেকর্ড হয়ে যায়; এভাবেই কয়েক ধাপে কয়েক হাজার লিটার করে মজুদের অতিরিক্ত অংশ বাইরে বিক্রি করা হয়ে থাকতে পারে।
জ্বালানি খাতের এই দুর্বলতা ও প্রশাসনিক তদারকির ফাঁক চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন যে, শুধু কাগজপত্র বদল করলেই বড় পরিসরে তেল অপচয় ও চুরি সম্ভব—যা সরাসরি রপ্তানি-আমদানি খরচ এবং দেশের জ্বালানি সুরক্ষাকে প্রভাবিত করতে পারে। তারা আরও বলেছে, ট্যাংকের ক্যালিব্রেশন কাজের ওপর তৃতীয় পক্ষকে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া ও বিএসটিআইয়ের ছাড়পত্র যাচাই-প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও কড়া করতে হবে।
যমুনা অয়েল কোম্পানি ও ফতুল্লা ডিপো থেকে এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক যা প্রতিক্রিয়া এসেছে তা প্রকাশ করা হয়নি; ডিপো ও কোম্পানি সূত্রের বর্ণনায় উপরোক্ত জালিয়াতির কৌশলগুলো উঠে এসেছে। ঘটনার আরও বিস্তারিত তদন্ত ও দায়-দায়িত্ব নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা বিশেষজ্ঞরা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছে।
(এই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত তথ্য পেশাদারি ভাবে সংকলন করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে পাওয়া নথি ও তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সাজানো — সরকারি কর্তৃপক্ষ বা তদন্তকার্যের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রকাশ না হলে উপরের সংখ্যা ও দিকগুলো পরিবর্তিত হতে পারে।)
