বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তিটি নির্বাচনকালীন রাজনৈতিক উত্তাপের আড়ালে অনেকটাই আলোচনার বাইরে থেকে গেছে। Office of the United States Trade Representative (USTR)–এর সঙ্গে ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, দুই দেশের অভ্যন্তরীণ অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন ও আনুষ্ঠানিক নোটিফিকেশন বিনিময়ের পর এর বাস্তবায়ন শুরু হবে। নোটিফিকেশন বিনিময়ের ৬০ দিন পর চুক্তিটি কার্যকর হবে বলে জানা গেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র মালয়েশিয়া ও কম্বোডিয়ার সঙ্গেও অনুরূপ চুক্তি করেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ওই দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত কাঠামোটি তুলনামূলকভাবে বেশি কঠোর ও শর্তনির্ভর।
চুক্তির ধারা ৩ অনুযায়ী, মার্কিন ডিজিটাল সেবার ওপর বাংলাদেশ কোনো ধরনের শুল্ক আরোপ করতে পারবে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে ভবিষ্যতে ডিজিটাল খাতে কর আরোপ বা নীতিগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সরকারের স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে। অন্যদিকে সমর্থকদের দাবি, এ ধরনের বিধান প্রযুক্তি ও ডিজিটাল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক হবে এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা আনবে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে ধারা ৪ নিয়ে, যা অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত। অনুচ্ছেদ ৪.১ ও ৪.২ অনুযায়ী, বাংলাদেশ যদি এমন কোনো দেশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাণিজ্য করে যারা বাজারমূল্যের নিচে পণ্য বিক্রি করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা নিতে পারবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে বাংলাদেশকে তা মেনে চলতে হবে এবং রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করতে হবে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এতে চীনসহ অন্যান্য দেশ থেকে কমদামে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ সীমিত হতে পারে এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্যনীতি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে পড়তে পারে।
ধারা ৪.৩–এ বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে এমন দেশ থেকে বাংলাদেশ পারমাণবিক চুল্লি বা জ্বালানি কিনতে পারবে না। এতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র–সহ ভবিষ্যৎ জ্বালানি প্রকল্পগুলো নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বিধান দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
চুক্তির ধারা ৫–এ নির্দিষ্ট খাতে মার্কিন পণ্য ও সেবা ক্রয়ের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। এতে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের খনিজ, গ্যাস ও টেলিযোগাযোগ খাতে প্রবেশাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি পোশাক খাতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে নির্দিষ্ট পরিমাণ মার্কিন তুলা আমদানির শর্ত রয়েছে। সংযুক্তি-৩ অনুযায়ী, Biman Bangladesh Airlines–কে ১৪টি বোয়িং বিমান কেনা, ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন এলএনজি আমদানি এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ গম, সয়াবিন ও তুলা কেনার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এসব শর্ত মুক্তবাজার নীতির চেয়ে বাধ্যতামূলক ক্রয়-বিধানের মতো বেশি, যা বাংলাদেশের বাস্তব চাহিদা ও সক্ষমতার সঙ্গে সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।
চুক্তির ধারা ৬–এর অনুচ্ছেদ ৬.৪ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে বাংলাদেশ কোনো শর্ত মানছে না, তাহলে তারা পূর্বের উচ্চ শুল্ক পুনরায় আরোপ করতে পারবে। এতে চুক্তির প্রয়োগ ও ব্যাখ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্য থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় World Trade Organization (WTO)–এর সরাসরি কোনো ভূমিকা নেই বলেও জানা গেছে।
এ ছাড়া চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ নির্দিষ্ট পরিমাণ মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম কেনার বিষয়েও সম্মত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে প্রতিরক্ষা খাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়তে পারে। সব মিলিয়ে চুক্তিটি এখন নীতিনির্ধারণী মহলে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। নতুন সরকার এটি বর্তমান রূপে অনুমোদন দেবে, নাকি পুনরায় আলোচনা করে আরও ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো অর্জনের চেষ্টা করবে—সেদিকেই নজর
সংগৃহীত
