বিশ্ববাণিজ্য যখন অনিশ্চয়তা, সংরক্ষণবাদ ও শুল্কযুদ্ধের চাপে টালমাটাল, ঠিক তখনই ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন-এর মধ্যে স্বাক্ষরিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রায় দুই দশক ধরে আলোচনায় থাকা এই চুক্তির আওতায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতীয় পণ্যের প্রায় ৯৯.৫ শতাংশে এবং ভারত ইউরোপীয় পণ্যের প্রায় ৯৬.৬ শতাংশে ধাপে ধাপে শুল্ক কমাতে সম্মত হয়েছে। এতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার শক্তির ভারসাম্যেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে।
এই চুক্তির পেছনে রয়েছে চলমান বৈশ্বিক শুল্ক উত্তেজনা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-এর সাম্প্রতিক শুল্কনীতি ভারতের জন্য বড় চাপ তৈরি করেছে। কিছু ভারতীয় পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত ভারতকে বিকল্প বাজার খোঁজায় বাধ্য করেছে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নও যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বাণিজ্য কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল অংশীদার খুঁজছে। এই বাস্তবতা থেকেই ভারত–ইইউ চুক্তি একটি কৌশলগত ও ভূ-অর্থনৈতিক সমঝোতায় রূপ নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে এই চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববাণিজ্য মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকেন্দ্রিক থাকলেও, ভারত–ইইউ অংশীদারিত্ব কার্যকর একটি তৃতীয় মেরু গড়ে তুলতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী দশকের শুরুতেই ইউরোপ থেকে ভারতে রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো বড় অঙ্কের শুল্ক সাশ্রয়ের সুবিধা পাবে। এর ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন জোট ও প্রতিযোগিতার কাঠামো তৈরি হবে।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক স্বার্থ চাপের মুখে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে ভারত–ইইউ বাণিজ্যের পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্র–ভারত বাণিজ্যের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ইউরোপীয় বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়লে এবং ভারতে ইউরোপীয় বিনিয়োগ জোরদার হলে, যুক্তরাষ্ট্র উভয় বাজারেই প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হারাতে পারে।
লাভ-ক্ষতির বিচারে দেখা যায়, স্বল্পমেয়াদে ইউরোপীয় শিল্পগোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পাবে। অটোমোবাইল, মেশিনারি, কেমিক্যাল ও স্টিল খাতে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো ভারতের বাজারে নতুন সুযোগ পাচ্ছে। বিপরীতে ভারত দীর্ঘমেয়াদে প্রযুক্তি হস্তান্তর, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে কাঠামোগত লাভের পথে এগোচ্ছে।
এই চুক্তির সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রভাব পড়তে পারে দক্ষিণ এশিয়ার তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে, বিশেষ করে বাংলাদেশ-এর ক্ষেত্রে। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাত প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ভোগ করছে এলডিসিভুক্ত দেশ হিসেবে পাওয়া শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধার কারণে। তবে ২০২৬ সালের পর এলডিসি থেকে উত্তরণের ফলে এই সুবিধা ধীরে ধীরে কমবে।
ঠিক এই সন্ধিক্ষণে ভারত–ইইউ চুক্তি বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। চুক্তির আওতায় ভারতীয় টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাকে শুল্ক শূন্যের দিকে নামলে, দামের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সুবিধা ক্ষয় হতে পারে। ভারতের শক্তিশালী ও সমন্বিত টেক্সটাইল ভ্যালু চেইন, দ্রুত লিড টাইম এবং সম্ভাব্য সবুজ রূপান্তর সহযোগিতা ইউরোপীয় বাজারে তাদের অবস্থান আরও শক্ত করবে।
ফলে এলডিসি-উত্তর সময়ে বাংলাদেশের ঝুঁকি বাড়বে একদিকে শুল্ক সুবিধা হ্রাস, অন্যদিকে ভারতের স্থায়ী শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার। এতে অর্ডার স্থানান্তর ও মূল্যচাপের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
তবে বাংলাদেশের কিছু শক্তিও রয়েছে বৃহৎ উৎপাদন সক্ষমতা, অভিজ্ঞ শ্রমশক্তি, নিটওয়্যারে বিশেষ দক্ষতা ও দীর্ঘদিনের ক্রেতা সম্পর্ক। এসব শক্তিকে ধরে রাখতে হলে এখনই কৌশলগত সিদ্ধান্ত জরুরি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে জিএসপি প্লাস বা সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া, উচ্চমূল্য সংযোজিত পোশাকে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে দ্রুত অগ্রগতি নিশ্চিত করাই হবে ভবিষ্যৎ পথ।
সব মিলিয়ে, ভারত–ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের জন্য একদিকে সতর্কবার্তা, অন্যদিকে সময়োপযোগী সংস্কার ও কৌশল গ্রহণের সুযোগ। এই সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অর্জিত অবস্থান ধীরে ধীরে চাপে পড়তে পারে।
ন্যাশনিক্স/এলকে
