ছাত্রলীগ নয়, শিবিরের ছদ্মবেশী চক্রান্তেই তৈরি হয়েছিল হেলমেট বাহিনী

অবশ্যই পরুন

২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজপথে যেসব হেলমেট পরা ব্যক্তিদের দেখা গিয়েছিল, যারা শিক্ষার্থীদের ওপর বেপরোয়া হামলা চালিয়ে সারাদেশে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল, তাদের পরিচয় নিয়ে তখন থেকেই বিতর্ক চলছিল। সরকারি দল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগকে দায়ী করে নানা অভিযোগ তোলা হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে আসছে ভিন্ন এক চিত্র।
বিভিন্ন গণমাধ্যম, বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যে জানা গেছে এই হেলমেটধারী সন্ত্রাসীদের বড় অংশই আসলে ছিল ছাত্রশিবিরের ছদ্মবেশী কর্মী, যারা পরিকল্পিতভাবে ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি ধ্বংসের মিশনে কাজ করেছিল।

বিশ্লেষক ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের মতে, “হেলমেট বাহিনী” নামটি একেবারে নতুন নয়। গত আট থেকে দশ বছর ধরেই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসে এমন কিছু ‘অতি উৎসাহী’ কর্মী দেখা গেছে, যারা কেন্দ্রীয় বা উচ্চ নেতৃত্বের কোনো নির্দেশনা ছাড়াই অতিরিক্ত আগ্রাসী আচরণ করত। এসব কর্মকাণ্ড প্রায়ই ছাত্রলীগকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলত এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংগঠনটির প্রতি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করত।

সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতারা জানিয়েছেন, “আমাদের সংগঠনে সবসময়ই কিছু কর্মী ছিল যারা নিজের উদ্যোগে ‘লীগার’ প্রমাণ করতে গিয়ে অপ্রত্যাশিত কাজ করে বসত। এখন দেখা যাচ্ছে, তাদের অনেকেই আসলে অন্য রাজনৈতিক সংগঠনের ছদ্মবেশী সদস্য ছিল।”


দীর্ঘদিন ধরে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রলীগই ছিল প্রধান সংগঠন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আওয়ামী রাজনীতির ধারক হিসেবে তারা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংগঠন বিস্তার করে এসেছে। কিন্তু শিবির, স্বাধীনতা বিরোধী রাজনীতির কারণে, ক্যাম্পাসে জনসমর্থন হারিয়ে ফেলে। শিক্ষার্থীদের মন জয় করতে না পেরে তারা নতুন কৌশল নেয় ছাত্রলীগের ভেতরে প্রবেশ করা, পরিচয় গোপন রেখে তাদের নাম ব্যবহার করা এবং সুযোগ পেলেই সহিংসতা ঘটিয়ে ছাত্রলীগকে বিতর্কিত করে তোলা।


২০২২ সাল থেকে এই অনুপ্রবেশ কৌশল আরও সক্রিয় হয়। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, তখনই শিবিরের অনেক কর্মী নিজেদের পরিচয় গোপন করে ছাত্রলীগে যোগ দেয়। পরবর্তীতে তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ইউনিটে পদও পায়। লক্ষ্য ছিল একটাই ছাত্রলীগের ভেতর থেকে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের চোখে সংগঠনের ভাবমূর্তি নষ্ট করা।

২০২৪ সালের জুন-জুলাই মাসে যখন কোটা সংস্কার আন্দোলন তীব্র আকার নেয়, তখন ঢাকাসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় হঠাৎ দেখা যায় হেলমেট পরা কিছু অজ্ঞাত ব্যক্তিকে। এরা মিছিল ভাঙছে, শিক্ষার্থীদের মারধর করছে, সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। পরদিন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এদের “ছাত্রলীগের হেলমেট বাহিনী” বলে প্রচার করা হয়।
এই প্রচারই ছিল শিবিরের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল ছাত্রলীগকে জনরোষের মুখে ফেলা এবং আন্দোলনকারীদের কাছে তাদের ঘৃণার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই বেরিয়ে আসে বিস্ময়কর কিছু তথ্য। দেখা যায়, আন্দোলনের সময় যাদের ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল, তাদের অনেকেই আসলে শিবিরের পুরনো কর্মী। প্রোথোম আলো, ইত্তেফাক ও অন্যান্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাবি শিবিরের সাবেক নেতা এস এম ফরহাদ ২০২২ সালের ছাত্রলীগ কমিটিতেও ছিলেন। একইভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও এমন একাধিক নাম সামনে আসে যারা ছাত্রলীগের পরিচয়ে কাজ করলেও পরবর্তীতে তাদের আসল রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ পায়।

রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটি ছিল শিবিরের এক সুচিন্তিত “মেগা মাস্টার প্ল্যান”। আওয়ামী রাজনীতির জনপ্রিয়তা ভাঙতে তারা ছাত্রলীগকে টার্গেট করে, কারণ ছাত্ররাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু সব সময়ই ছিল এই সংগঠন।

বিশ্লেষক ড. সাদিক আহমেদ বলেন, “এটা নিছক সংগঠনের ব্যর্থতা নয়। পরিকল্পিতভাবে শিবির ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশ করেছিল। হেলমেট বাহিনীর মূল উদ্দেশ্য ছিল ছাত্রলীগকে হিংস্র বাহিনী হিসেবে দেখানো এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে আওয়ামী বিরোধী মনোভাব ছড়িয়ে দেওয়া।”

এই ছদ্মবেশী কর্মীরা আন্দোলনের সময় বিশেষ কৌশলে কাজ করত। তারা হামলার সময় নিজেদের ছাত্রলীগ কর্মী বলে পরিচয় দিত, যাতে মিডিয়ার ক্যামেরায় তা ধরা পড়ে এবং পুরো দায় ছাত্রলীগের ওপর পড়ে। এর ফলে একদিকে ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, অন্যদিকে শিবির নিজেদের পরিচয় গোপন রেখেই লক্ষ্য পূরণ করতে পারে।

আওয়ামী লীগের পতনের পর অনেক ক্যাম্পাসেই দেখা গেছে, কিছু “লীগার” নেতা তাদের আসল শিবির পরিচয় প্রকাশ করছে। কেউ কেউ এমনও স্বীকার করেছে যে তারা রাজনৈতিক সুবিধার জন্য এবং “অপরাধের দায় এড়াতে” ছাত্রলীগের পরিচয়ে কাজ করেছিল।

এখন অনেক নাগরিক সংগঠন ও সাবেক ছাত্রনেতা দাবি করছেন, হেলমেট বাহিনীর পরিচয় উন্মোচনে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা হোক। তাদের মতে, যদি সত্যিকারের তদন্ত হয়, তবে বেরিয়ে আসবে ছাত্রলীগের নামে যে সহিংসতার দায় চাপানো হয়েছিল, তার বড় অংশই ছিল শিবিরের গুপ্ত রাজনীতির ফল।

২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে যেসব ভয়ঙ্কর অভিযোগ তোলা হয়েছিল, সময়ের ব্যবধানে আজ তার পেছনের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠছে। হেলমেট বাহিনী ছিল না ছাত্রলীগের প্রকৃত চিত্র, বরং এটি ছিল শিবিরের ছায়ামূর্তি যারা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শধারী সংগঠনটির চরিত্রহননে সফল হলেও ইতিহাসের বিচারে আজ উন্মোচিত হচ্ছে তাদের আসল মুখোশ।

ন‍্যাশনিক্স/একেএ

আরও নিবন্ধ

সর্বশেষ সংবাদ