শেখ হাসিনা ও কামালের বিচারে আন্তর্জাতিক মান পূরণ হয়নি বলে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

অবশ্যই পরুন

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বলেছে, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের অনুপস্থিতিতে ঘোষিত মৃত্যুদণ্ডের রায় আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। সংস্থাটি উদ্বেগ জানিয়ে বলেছে, অভিযুক্তরা নিজেদের পছন্দের আইনজীবীর মাধ্যমে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পাননি, যা মানবাধিকারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

এই মামলার তৃতীয় আসামি সাবেক পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে বিবেচনা করার পর তার শাস্তি কমিয়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে শিক্ষার্থী নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হওয়ার ঘটনার পর এই মামলা হয়। মানবাধিকার সংস্থা বলছে, ঘটনার সময় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও দমনপীড়নের অভিযোগ ছিল, যা আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

অভিযোগপত্রে শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের ওপর সংগঠিত আক্রমণ, দমন অভিযান চালানোর নির্দেশ, প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি ও হত্যাকাণ্ড ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ আনা হয়। বিচার চলাকালে মোট ৫৪ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন, যাদের মধ্যে ছিলেন বিশেষজ্ঞ, ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার। আদালতে শেখ হাসিনার কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ডিংও উপস্থাপন করা হয়, যেখানে তাকে নিরাপত্তা বাহিনীর অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিতে শোনা যায় বলে দাবি করা হয়।

রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা সাক্ষীদের জেরা করলেও আত্মপক্ষ সমর্থনে কোনো সাক্ষী হাজির করা হয়নি। এইচআরডব্লিউর মতে, অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থন, সাক্ষী জিজ্ঞাসাবাদ ও আইনজীবী বেছে নেওয়ার অধিকার আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের অপরিহার্য অংশ, যা এই মামলায় রক্ষা করা হয়নি। মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়ায় সংস্থাটি বিচার নিয়ে আরও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

রায়ের ৪৫৩ পৃষ্ঠার বিবরণে আদালত জানায়, রোম স্ট্যাটিউটের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদের আলোকে বিচার পরিচালিত হয়েছে। বিচারকরা বলেছেন, ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য আদালতের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। রায়ে শেখ হাসিনা নিজের নেতৃত্বের দায় স্বীকার করেছেন বলেও উল্লেখ করা হয়।

এইচআরডব্লিউ বলেছে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অতীতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অভিযোগের মুখে পড়েছিল। তাই মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার অবশ্যই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায় হওয়া উচিত। সংস্থাটি মনে করে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা মানে অভিযুক্তদের অধিকারও সুরক্ষিত রাখা।

২০২৪ সালে শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন মুহাম্মদ ইউনুস। তার সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন সংশোধন করে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও কমান্ড দায়িত্বকে রোম স্ট্যাটিউটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে। তবে ২০২৫ সালে দল ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা যুক্ত হওয়ায় সংস্থাটি উদ্বেগ জানায়। রায়ে আওয়ামী লীগ ভাঙার নির্দেশ না থাকলেও শেখ হাসিনা ও কামালের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করা হয়।

এইচআরডব্লিউ আরও জানায়, সংবিধানের ৪৭(৩) ও ৪৭এ ধারা আন্তর্জাতিক অপরাধে অভিযুক্তদের আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করে। তাই সবার জন্য সমান সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং মৃত্যুদণ্ড স্থগিত রেখে তা বিলোপের পথে এগোনো প্রয়োজন।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর ও বাংলাদেশ সরকার তিন বছরের মানবাধিকার সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেয়। সংস্থাটি মনে করে, আন্তর্জাতিক সহায়তা জোরদার করতে হলে মৃত্যুদণ্ড স্থগিতের সিদ্ধান্ত এখন জরুরি।

রায় ঘোষণার পর বাংলাদেশ সরকার ভারতকে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামালকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানায়। এইচআরডব্লিউ বলেছে, প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং মৃত্যুদণ্ড বা অন্যায্য বিচারের ঝুঁকি বিবেচনা করা উচিত। সংস্থাটির এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ব্যক্তিরা ন্যায়বিচারের অধিকার রাখেন, তবে প্রকৃত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে অভিযুক্তদের অধিকারও সমানভাবে রক্ষা করা প্রয়োজন।

ন্যাশনিক্স/এজে

আরও নিবন্ধ

সর্বশেষ সংবাদ