বিচার, ক্ষমতা ও নিঃশব্দের যাত্রা: ক্যাঙারু কোর্টের গল্প

অবশ্যই পরুন

নাৎসি জার্মানি, একটি অন্ধকার আদালত কক্ষ। ভেতরে গুমোট বাতাসের সাথে মিশে আছে মানুষের নীরব ভীতি। ছোট্ট শহরের রাস্তাগুলো পুরো নিস্তব্ধ, ঝরা পাতারাও যেন ভয় পাচ্ছে। People’s Court-এর কক্ষে রোল্যান্ড ফ্রিসলারের কণ্ঠে কিছু নাম উচ্চারিত হল, আর হাজারো মানুষের ভাগ্য স্থির হয়ে গেল। রায় আগে থেকে ঠিক করা। কোন আইনের তোয়াক্কা নেই, নেই নিয়মের বালাই। প্রতিটি শব্দ যখন বাতাসে ভেসে যাচ্ছে, প্রত্যেক সেকেন্ড নিভে যাচ্ছে অসংখ্য মানুষের জীবন প্রদীপ। দেশ বিরোধী আখ্যা দিয়ে ফাঁসি দেওয়া হচ্ছে ভিন্ন দলমতের মানুষকে। শহরের মানুষের মুখে ভয়ের ছাপ, হৃদয়ে বিভীষিকা। জীবনের স্বপ্ন, আশা, ভবিষ্যতের আলো—সবই যেন এক ঝটকায় নিভে যাচ্ছে।

সময় বয়ে যায়। রাশিয়ার রাজধানীতে ভ্লাদিমির কারা-মুরজা দাঁড়িয়ে আছেন গোপন আদালতের সামনে। ঘরের অন্ধকারে প্রতিটি পদক্ষেপ যেন ভয়ে চেপে বসেছে। রায় আগেই নির্ধারিত, সাক্ষ্য বা যুক্তি কোনো কাজে আসবে না। তাঁর চোখে অল্প অস্থিরতা, কিন্তু ভেতরে চুপচাপ ভয়। বাইরের পুরো পৃথিবী প্রতিবাদ করছে, কিন্তু শহরের ভিতরে মানুষের কন্ঠে স্তব্ধতা ভর করেছে। ভয়ের ছায়া বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে, যেন প্রতিটি শব্দ শোনার ক্ষমতাও হারিয়ে গেছে।

চীনের রাজধানীর পথে দাঁড়ানো তিয়েন আনমেন আন্দোলনের ছাত্ররা স্বপ্ন বয়ে এনেছিল। চোখে আশা, কণ্ঠে প্রতিবাদ, হৃদয়ে স্বাধীনতার আগুন। কিন্তু আদালতের ঘরে সেই আগুন নিভে গেল। গোপন ট্রায়াল, সাক্ষ্য উপেক্ষা, আজীবন কারাগার এবং মৃত্যুদণ্ড—সবই মিলেমিশে স্বাধীনতার আগুনকে নিভিয়ে দিয়েছে। দেশে চেপে বসে নিস্তব্ধতা; আন্তর্জাতিকভাবে স্পষ্ট ক্ষতচিহ্ন।

মিসরের আদালতের কক্ষে মুহাম্মাদ মুরসি এবং তার সমর্থকরা দাঁড়িয়ে আছেন একসাথে। শতাধিক মানুষের জীবন ঝুঁকিতে। বছরের পর বছর পশ্চিমাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নকারীরা অভিযোগ এনেছে “মিশরের ইতিহাসে গুপ্তচরবৃত্তির সবচেয়ে বড় মামলা”। নানা নাটকীয়তা শেষে দ্রুত রায় ঘোষণা করা হলো। মুরসি সহ ১২০ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হল। রাস্তায় রাজনৈতিক ছড়িয়ে পড়ল প্রতিশোধের ছায়া। গণমাধ্যম চুপচাপ, স্বৈরতান্ত্রিক শক্তি দৃঢ়ভাবে চেপে ধরল জনগণের কন্ঠ। প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে গেল ভয়ের নিঃশ্বাস।

মিয়ানমারেও মঞ্চিত হয়েছে বিচারের প্রহসন। অং সান সুকি সামরিক আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, চোখে ভীতির ছায়া। কোন আইনজীবী নেই, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিষিদ্ধ। রায় আসে: ৩০ বছরের বেশি কারাদণ্ড। শহরের রাস্তায় আগুন, মানুষের চিৎকার, বিক্ষোভ—সবই ঘটল একসাথে। নিঃশব্দ আর ভয়ের ছায়া সমাজে ছড়িয়ে পড়ল। দেশজুড়ে শুরু হল গৃহযুদ্ধ। ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে সাধারণ জনগণ বেচে আছে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর প্রাণ হারানোর শংকা নিয়ে।

ভারতের গ্রামীণ পথে খাপ পঞ্চায়েতের রায়ও একই রঙ বহন করে। প্রেম, বিয়ে বা ধর্মান্তরের নামে দেওয়া হয় হত্যার রায়। সুপ্রিম কোর্ট এগুলোকে নিষিদ্ধ করলেও, গ্রামীণ সমাজে সহিংসতার ছায়া এখনও রয়ে গেছে।

পাকিস্তানে ২০১৪ সালে, দেশটির প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের সরকার সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমঝোতা করে বিশেষ সামরিক আদালত প্রতিষ্ঠা করেছিল। দ্রুত বিচারের নামে এই ব্যবস্থা ধীরে ধীরে বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা গ্রাস করতে থাকে। যেখানে ছিলনা সঠিক প্রক্রিয়া এবং ন্যায়বিচার। এই সামরিক আদালতগুলো একটা সময় সাধারণ নাগরিকদেরও বিচারের আওতায় নিয়ে আসে। যেখানে অভিযোগের তদন্ত প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত দ্রুত এবং প্রমাণের গুরুত্ব কখনোই পূর্ণভাবে পর্যালোচনা করা হয়নি। আইনজীবীর উপস্থিতি ছিল সীমিত এবং অভিযুক্তদের অধিকাংশ সময় আইনি সহায়তা পাওয়া অসম্ভব ছিল। এমনকি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও পাকিস্তানে সামরিক আদালতের বিচার ব্যবস্থাকে তীব্রভাবে সমালোচনা করেছে। এটি নাগরিকদের মৌলিক অধিকারকে লঙ্ঘন করে এবং সামরিক বাহিনীর ক্ষমতাকে আরও সুদৃঢ় করে। একই সাথে ভেঙে দেয় সেনা শাসিত পাকিস্তানে টিকে থাকা বিচার ব্যবস্থা।

জিম্বাবুয়ে, ইরাক ও উত্তর কোরিয়ার দৃশ্যও একই রঙে আঁকা। কারাবন্দী সাদ্দাম হুসেইন অপরাধের প্রমাণ ছাড়াই পূর্ব নির্ধারিত ফাঁসিতে ঝুলে যায়, কিম জং উনের চাচাকে কয়েক ঘণ্টার ট্রায়াল শেষে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সব জায়গায় একই চিত্র: ভয়, নিপীড়ন, একনায়কতন্ত্র। শেখ হাসিনার রায় ঘোষণার সাথে সাথে বাংলাদেশ প্রবেশ করবে এই মঞ্চে। এই বিচার ব্যবস্থা ধীরে ধীরে গ্রাস করবে পুরো সমাজকে। প্রকাশ্যে আসবে গণতন্ত্রের দোহাই দেওয়া মানুষজনের স্বৈরাচারী রূপ। যার থেকে রেহাই পাবে না দৃশ্য অদৃশ্য কোন পক্ষ। ক্যাঙারু কোর্টকে সমর্থন জানানো প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে একদিন দাড়াতে হবে আসামীর কাঠগড়ায়।

এই দীর্ঘ যাত্রা আমাদের শেখায় ক্যাঙারু কোর্ট কোন বিচারিক প্রক্রিয়া নয়। এটি ক্ষমতার লড়াই, প্রতিশোধের আগুন এবং মানবাধিকারের নীরব নিপীড়ন। যেখানে বিচার ব্যবস্থা স্বাধীন নয়, সেখানে সত্য কেবল শাসকের আকাঙ্খা। মানুষের আশা, স্বপ্ন এবং স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ থাকে মুখোশে।

আরও নিবন্ধ

সর্বশেষ সংবাদ