আজকে অনেক না বলা কথা, যেগুলো সাধারণ মানুষ জানেন না, সে বিষয়ে সংক্ষেপে লিখবো। আপনারা অনেকে জানেন যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের অন্যতম অংশ হিসেবে বানানো হয় বাংলাদেশের এলজিবিটি কমিউনিটিকে। কমিউনিটির অনেক মানুষ জেনে বা না জেনে এই ষড়যন্ত্রের অংশ হয়ে যায়, এবং অনেকে এখনো সেই ষড়যন্ত্রের সক্রিয় অংশীদার।
বাংলাদেশের এলজিবিটি কমিউনিটিকে এই ষড়যন্ত্রে অন্তর্ভুক্ত করার সূচনা হয় আমার সংগঠন “ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ”-এর তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক তাসনুভা আনানকে রাতারাতি আলোচিত করে তোলার মাধ্যমে। এই কাজটি করা হয়েছিল তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন পলিটিক্যাল অফিসারের প্রভাবে, যিনি বৈশাখী টিভির কিছু কর্মীর সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। তার ইচ্ছায় বৈশাখী টিভি তাসনুভা আনানকে নিউজ প্রেজেন্টার হিসেবে উপস্থাপিত করে এবং তাকে তার অজান্তে তৎকালীন মার্কিন দূতাবাসের ইচ্ছানুযায়ী মিডিয়াতে কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করা হয়।
তবে সঙ্গত কারণে তাসনুভা আনান সেরকম কিছু না করলে, বৈশাখী টিভি থেকেই তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম আইভিএলপিতে মনোনয়নের লোভ দেখানো হয়। কিন্তু আশানুরূপ কিছু না হওয়ায়, এবং এর আগেই তাসনুভা আনান নন-ইমিগ্র্যান্ট মার্কিন ভিজিটর ভিসা পাওয়ার পর নিজের উদ্যোগে নিউইয়র্কে পারি জমানোর ফলে শেষ পর্যন্ত তাকে কেন্দ্র করে সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
তৎকালীন মার্কিন দূতাবাস তার ভিসা ইস্যু করলেও, তারা বাংলাদেশ ইমিগ্রেশনে তার যাত্রা বাতিল করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে, যাতে তাসনুভার বিদেশযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয় এবং এর দায়ভার তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর চাপিয়ে কিছু সংবাদ ভাইরাল করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন নীতির কারণে তাসনুভাকে যাত্রা থেকে বিরত রাখা হয়নি। বরং সরকার জানিয়ে দেয় যে যদি দূতাবাস তার যুক্তরাষ্ট্র যাত্রা না-ই চাইত, তাহলে কেন ভিসা ইস্যু করা হলো এবং কেন এখনো তা বাতিল করা হয়নি—সুতরাং এর দায়ভার তারা নিতে অপারগ।
তাসনুভার যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর এই ষড়যন্ত্রের জন্য নতুন কমিউনিটি মুখপাত্র খোঁজা হয় এবং খুব দ্রুতই তারা হোচিমিনকে নিয়োগ করে। হোচিমিন জেনে-শুনেই প্রতিদিন নতুন নতুন নিউজ ভাইরাল করতে মরিয়া হয়ে পড়ে। তার এই কাজে সহযোগিতা করে প্রথম আলো। আপনারা যদি তার সব নিউজ কাভারেজ খেয়াল করেন, দেখবেন ৫০%-এর বেশি এসেছে প্রথম আলোর জনাব মানসুরা হোসেনের মাধ্যমে।
একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকাণ্ড এবং সেগুলো মিডিয়ায় প্রচার করে হোচিমিন কমিউনিটির সাধারণ মানুষের সুনাম নষ্ট করে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ যারা আগে ট্রান্স বা হিজড়া মানুষদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, তারা হঠাৎই ট্রান্স ও হিজড়াবিরোধী হয়ে ওঠেন। এর সাথে যুক্ত হয় ধর্মীয় নাম ব্যবহারকারী রাজনৈতিক গোষ্ঠী, যারা সরকারবিরোধী আন্দোলনে সমকামিতা, এলজিবিটি, ট্রান্স ও হিজড়া ইস্যু নিয়ে সরব হয়।
এরই মধ্যে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে হোচিমিনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেখা করার ব্যবস্থা করা হয়। শেখ হাসিনা তার স্বভাবসুলভ কারণে হোচিমিনের কথা শোনেন। যদিও তৎকালীন সরকার বাংলাদেশের ট্রান্স সমাজের জন্য ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করেছিল, ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তারা সরকারকে ট্রান্স সুরক্ষা আইন করার পরামর্শ দেয়। হোচিমিন সফলভাবে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করায় পুরস্কারস্বরূপ তাকে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের আইভিএলপি প্রোগ্রামে মনোনীত করা হয়—যা হোচিমিনের ভাষায় ছিল “রানীর মতো” বিদেশ ভ্রমণ।
এই পরামর্শ বাস্তবায়নের আরেক সহযোগী ছিল বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি, যারা “সমতা প্রকল্প”-এর নামে ইউএসএআইডির কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের ইউপিআর রিভিউতে আমার সংগঠন বাংলাদেশের জেন্ডার পলিসিতে নারী, পুরুষ এবং “অন্যান্য”—এই তিন ক্যাটাগরি রাখার সুপারিশ করে যাতে ঝামেলা ছাড়াই সকল জেন্ডারের অন্তর্ভুক্তি হয়। কিন্তু সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে বন্ধু ও কয়েকটি এনজিও এন্টি-ডিসক্রিমিনেশন আইন ও ট্রান্স সুরক্ষা বিলের সুপারিশ করে।
নির্বাচনের কিছু পরেই বন্ধু আইন বাস্তবায়নে উঠে পড়ে লাগে এবং সোনারগাঁও হোটেলে নীতি সংলাপ আয়োজন করে। সেই অনুষ্ঠান থেকে ভিডিও ভাইরাল করে জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে উস্কে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সপ্তম শ্রেণীর পাঠ্যবইতে ভুলভরা ট্রান্স বর্ণনা সংযোজন করে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়ানো হয়।
এর ধারাবাহিকতায় শুরু হয় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনারেল এডুকেশন স্কুলের ইন্টেরিম ডিন ও তার অধীনে নৃবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক করা কিছু শিক্ষার্থী এই ষড়যন্ত্রে অংশ নেন। এমন একজন শিক্ষার্থী, যিনি “লোকায়ত বিদ্যালয়” নামে একটি থিঙ্ক ট্যাংক পরিচালনা করেন, দিনের পর দিন এলজিবিটি সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড চালান। তারা ফরহাদ মাজহার-এর অনুসারী এবং পাঠচক্র নামে অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশ নিতেন।
এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ইন্টেরিম ডিন আসিফ মাহতাবকে বহিষ্কার করেন। এরপর আসিফ মাহতাব এ প্রকল্প আরও এগিয়ে নিয়ে যান। এরপর কি ঘটেছে তা আপনারা জানেন—কোটা আন্দোলনে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় নজিরবিহীনভাবে সবার আগে রাস্তায় নামে। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন রাজনৈতিক আন্দোলনে দেখা যায়নি। বিনিময়ে ব্র্যাক ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় যুক্তরাষ্ট্রের মোটা অঙ্কের আর্থিক সহায়তা পায়।
ব্র্যাকের ষড়যন্ত্র সেখানে থেমে থাকেনি। ব্র্যাক ব্যাংক আমাকেও মানসিকভাবে নির্যাতন শুরু করে। তারা মনে করেছিল আমি হয়তো হোচিমিনের মতো সাংবাদিক ডেকে নিউজ ভাইরাল করবো। কিন্তু আমি জানতাম যে এই কাজগুলো কারো প্ররোচনায় হচ্ছে। এরই মাঝে আমাকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এলজিবিটি বিষয়ে কথা বলার জন্য আমন্ত্রণ জানায় এবং গোপনে আমার ভিডিও ধারণ করে—যদিও সেখানে মোবাইল বা রেকর্ডিং নিষিদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে সেই ভিডিও নাম-বেনামে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করা হয়। ক্ষমা চাইলেও তা ছিল কেবল আনুষ্ঠানিকতা। সরকার পতনের পর আমাকে বিনা কারণে চাকরিচ্যুত করা হয় এবং ব্র্যাকের নির্বাহী আসিফ সালেহ-এর সঙ্গেও যোগাযোগ করে কোনো সুরাহা পাইনি, কারণ তারাও এই ষড়যন্ত্রের অংশ।
ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস হোচিমিনকে ব্যবহার করেই থেমে থাকেনি। তারা মুনতাসির রহমান নামের এক কমিউনিটির মানুষকে বেছে নেয়, যিনি খ্যাতির লোভে হোচিমিনের মতোই পাগল। তাকে ফেসবুক (মেটা)-এর সঙ্গে বাংলাদেশের এলজিবিটি কমিউনিটির লিয়াজোঁ হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়—যা দেখে সবাই অবাক হয়, কারণ যার ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান নেই তাকে কেন এমন দায়িত্ব দেওয়া হলো? কিছুদিন পর তার আয়োজিত একটি লাইভ আলোচনায় কেউ নগ্ন ভিডিও প্রচার শুরু করে, এবং সেটি ২০ সেকেন্ডেরও বেশি সময় ধরে চলে। মুনতাসির রহমান এই ক্ষমতায়নের লোভে এনসিপির সব ষড়যন্ত্রে সম্পৃক্ত হয় এবং কমিউনিটির বিরুদ্ধে জনগণকে ক্ষেপিয়ে তোলে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার সরকার বাংলাদেশের একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি যারা এলজিবিটি কমিউনিটি সহ দেশের সব মানুষের জন্য ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। ট্রান্সজেন্ডার মানুষরা তাকে “মা” বলতে বলতে অজ্ঞান হয়ে যেত। আর তারাই এখন “নারায়ে তাকবীর” ও “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” স্লোগান দেয়। কিন্তু এতে কোনো লাভ হয়নি। বরং যে উন্নয়ন হয়েছিল সবই আজ ধ্বংস হয়েছে। আর যা বাকি আছে, তা শেষ হতে এই বছরের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। প্রকৃতির শোধ বলে একটি কথা আছে—সেটা অবশ্যই আসবে।
লেখা: সঞ্জীবনী সুধা
