ঢাকার বিস্ফোরণ কি রূপপুরকে টার্গেট করার গোপন বার্তা?

অবশ্যই পরুন

২০২৫ সালের অক্টোবর মাস। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ইউরোপের মধ্যাঞ্চল কেঁপে উঠল দুইটি বিধ্বংসী বিস্ফোরণে। হাঙ্গেরির Százhalombatta এবং রোমানিয়ার Ploiești শহরের দুটি বৃহৎ তেল শোধনাগার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো। এই দুটি শোধনাগারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল ছিল দুইটিই রাশিয়া থেকে আমদানিকৃত কাঁচা তেল প্রক্রিয়াকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।

এই বিস্ফোরণগুলি ২০২২ সালে নর্ড স্ট্রিম গ্যাস পাইপলাইনে ঘটে যাওয়া রহস্যজনক বিস্ফোরণের স্মৃতি আবারও তাজা করে দিল। তখন প্রথমে রাশিয়াকে দোষারোপ করা হলেও পরবর্তী জার্মান তদন্তে ইউক্রেনীয় নাগরিকদের জড়িত থাকার ইঙ্গিত মেলে, যা চিত্রটির জটিল নকশার ইঙ্গিত দেয়। বর্তমান ঘটনাগুলোও যেন একই নকশার ছাঁচে ঢালা: সেসব ইউরোপীয় অঞ্চলে আঘাত হানা, যেখানে রাশিয়ার শক্তি সরবরাহ এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।

একটি পরিচিত নমুনা: সংবেদনশীল লক্ষ্য, রহস্যময় অগ্নিকাণ্ড

মজার ব্যাপার হলো, এই ঘটনাপ্রবাহ শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ নয়। সম্প্রতি ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো টার্মিনালে একটি রহস্যময় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সেই আগুনে পুড়ে যায় রাশিয়া থেকে আগত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি। সরকারি তদন্তের ধীরগতি এবং ঘটনাটি নিয়ে অস্বাভাবিক নীরবতা অনেক বিশ্লেষককেই প্রশ্ন করতে বাধ্য করছে।

এই সমস্ত ঘটনায় একটি স্পষ্ট সাধারণ সূত্র বিদ্যমান:

· লক্ষ্যগুলো সংবেদনশীল অবকাঠামো: তেল শোধনাগার, গ্যাস পাইপলাইন, পারমাণবিক প্রকল্পের সরঞ্জাম।
· রাশিয়ান সংযোগ: সকল ক্ষেত্রেই রাশিয়ার শক্তি খাত বা রপ্তানির সাথে সরাসরি সংযোগ রয়েছে।
· পদ্ধতি: অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণ একটি সাধারণ কৌশল।

কে লাভবান? জিওপলিটিকাল চেসবোর্ডে একটি সুস্পষ্ট চাল

জিওপলিটিক্সের মূল নিয়মটি হলো: কে লাভবান হচ্ছে তা দেখুন। এই বিস্ফোরণগুলোর সরাসরি ফলাফল হলো ইউরোপে রাশিয়ান তেল ও গ্যাসের সরবরাহ আরও সংকুচিত হওয়া। এই শূন্যতা পূরণের জন্য সবচেয়ে প্রস্তুত ও লাভবান রাষ্ট্রটি হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যারা ইতিমধ্যেই ইউরোপে তাদের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) ও তেল রপ্তানি বাড়িয়ে রেকর্ড মুনাফা অর্জন করছে।

পশ্চিমা বিশ্লেষকরাই স্বীকার করছেন, “প্রতিটি পাইপলাইন বিস্ফোরণ বা রিফাইনারি বন্ধ হওয়া ইউরোপকে মার্কিন নির্ভরতার দিকে আরও গভীরে ঠেলে দিচ্ছে।” এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি কৌশলগত বাজার দখলের যুদ্ধ, যেখানে ইউরোপের শক্তি নিরাপত্তা পণ্যে পরিণত হচ্ছে।

বাংলাদেশ: দক্ষিণ এশিয়ার নতুন ফ্রন্ট?

এই কৌশল শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি এখন বাংলাদেশের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। ঢাকা বিমানবন্দরের অগ্নিকাণ্ডটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক খেলার অংশ হতে পারে।

মনে রাখতে হবে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের বর্তমান ভূমিকা ও আগ্রহের কথা। যার সংস্থার সাথে বাংলাদেশ সরকার বাজার দামের চেয়ে significantly উচ্চ মূল্যে LNG আমদানির বিতর্কিত চুক্তি করেছে। একই সাথে, বাংলাদেশের সকল তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ, কৌশলগত চট্টগ্রাম বন্দর, এবং বঙ্গোপসাগরে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ঘাঁটি স্থাপনের প্রচেষ্টা সর্বত্রই একটি নির্দিষ্ট দেশের কর্পোরেট ও স্ট্যাটেজিক আগ্রহ সক্রিয় রয়েছে।

প্রশ্নটি অনিবার্য: বাংলাদেশের প্রশাসন কি এসব সম্পর্কে অসচেতন ?

উত্তরটি সম্ভবত ‘না’। কর্তৃত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা নিশ্চয়ই এই জটিল সম্পর্ক ও পরিণামগুলি বোঝেন। তবে, তখন একটি গভীরতর প্রশ্ন উঠে আসে: যখন মূল ব্যক্তিই হয়তো বাহ্যিক শক্তির ‘এজেন্ট’ বা স্বার্থের সাথে গভীরভাবে জড়িত, যখন প্রধান উপদেষ্টাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীই বিদেশি নাগরিকত্ব ধারণ করেন, তখন তাদের আনুগত্য কার প্রতি? তারা কি বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে নীতিনির্ধারণ করেন, নাকি তাদের ‘নিয়োগকর্তা’ জিওপলিটিক্যাল উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কাজ করেন?

লেখক: অধ্যাপক মন্জুরুল করিম।

আরও নিবন্ধ

সর্বশেষ সংবাদ