ডব্লিউএইচও থেকে পদত্যাগ, মুখ খুললেন সায়মা ওয়াজেদ
নিজের পেশাগত পরিচয়, দায়িত্ব পালনকালে বিতর্ক এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে দীর্ঘ বক্তব্য দিয়েছেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে দীর্ঘদিন বিনা বেতনে ছুটিতে থাকার পর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক আঞ্চলিক পরিচালক সায়মা ওয়াজেদ পুতুল নিজের পেশাগত জীবন ও সংস্থাটি থেকে পদত্যাগের কারণ নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দিয়েছেন। সেখানে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, ডব্লিউএইচওর অভ্যন্তরীণ তদন্ত এবং সংস্থাটির মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
বক্তব্যে সায়মা ওয়াজেদ নিজেকে জনস্বাস্থ্য পেশাজীবী, মনোবিজ্ঞানী এবং অটিজম, মানসিক স্বাস্থ্য ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারের একজন প্রবক্তা হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে তিনি জনস্বাস্থ্য ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগের মাধ্যমে নীতি, কর্মসূচি ও কৌশলগত কার্যক্রমে অবদান রাখার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
পারিবারিক পরিচয়ের বাইরে পেশাগত পরিচয়
সায়মা ওয়াজেদ বলেন, গত এক বছরেরও বেশি সময়ে তাঁর পেশাগত কাজের তুলনায় পারিবারিক পরিচয় বেশি আলোচনায় এসেছে। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা হিসেবে পরিচিত হলেও নিজের পেশাগত অর্জনকে স্বতন্ত্রভাবে মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছেন।
নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশেষজ্ঞ ডিগ্রি ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পাশাপাশি শিক্ষা নেতৃত্ব বিষয়ে ডক্টরেট অর্জনের জন্য কাজ করার কথাও উল্লেখ করেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, শৈশবেই পরিবারের অনেক সদস্যকে হারানোর অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকা এবং সাহসের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করার শিক্ষা তিনি পরিবার থেকেই পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হওয়ার দাবি
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজের পেশাগত পরিচয় ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে বলে দাবি করেন সায়মা ওয়াজেদ। তাঁর অভিযোগ, পারিবারিক পরিচয়ের কারণে তাঁর দীর্ঘদিনের পেশাগত কাজকে উপেক্ষা করা হয়েছে এবং তাঁকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে।
তিনি জানান, ২০২৫ সালের ৯ জুলাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাঁকে অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠায়। তাঁর দাবি, ওই সিদ্ধান্তের পেছনে যথাযথ ভিত্তি ছিল না এবং তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়নি।
সায়মার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ডব্লিউএইচও তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। এ বিষয়ে সংস্থাটির মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তবে তাঁর বক্তব্যে উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন
সায়মা ওয়াজেদের অভিযোগ, বাংলাদেশের আইনি কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার জন্য তিনি যথাযথ আইনি নোটিশ পাননি। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট জমির ওপর নিজের বৈধ অধিকার ছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধে পরিচালিত আইনি প্রক্রিয়ায় নানা ত্রুটি ছিল।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে নিজের অবস্থানের পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করা সত্ত্বেও তাঁকে বিনা বেতনে ছুটিতে রাখা হয়। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক সংস্থাটির উচিত ছিল নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীর আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার রক্ষা করা।
ডব্লিউএইচওর অভ্যন্তরীণ তদন্তের প্রসঙ্গে সায়মা বলেন, চীনে একটি সফরের জন্য ৯০১ মার্কিন ডলারের ব্যয় দাবি নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ভ্রমণসংক্রান্ত জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছিল। অসুস্থতার কারণে তিনি ওই সফরে যাননি বলে দাবি করেন তিনি।
তাঁর অভিযোগ, এ ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে তাঁকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ডব্লিউএইচওর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখানে উল্লেখ করা হয়নি।
সূচনা ফাউন্ডেশন বন্ধ হওয়া নিয়েও ক্ষোভ
নিজের প্রতিষ্ঠিত অলাভজনক সংস্থা সূচনা ফাউন্ডেশন নিয়েও বক্তব্য দিয়েছেন সায়মা ওয়াজেদ। তাঁর দাবি, ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থা অটিজম, প্রতিবন্ধিতা ও জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করেছে।
তিনি জানান, সংস্থাটি জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) পরামর্শমূলক মর্যাদা লাভ করেছিল। পাশাপাশি জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যৌথ অনুষ্ঠান আয়োজন, গবেষণা এবং কৌশলগত নথি প্রণয়নে যুক্ত ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সায়মার অভিযোগ, অপতথ্য, গুজব ও হয়রানির কারণে সূচনা ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে সংস্থাটির মাধ্যমে সহায়তা পাওয়া জনগোষ্ঠী গুরুত্বপূর্ণ সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
১০ মাস বিনা বেতনে থাকার পর পদত্যাগ
সায়মা ওয়াজেদ জানান, প্রায় ১০ মাস বিনা বেতনে প্রশাসনিক ছুটিতে থাকার পর তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর দাবি, ডব্লিউএইচওর অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, স্বাধীন তদন্ত এবং যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টা করেও তিনি সফল হননি।
তিনি আন্তর্জাতিক সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য নৈতিক আচরণবিধি এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারের বিষয়টিও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা জরুরি।
ডব্লিউএইচওর গুরুত্ব স্বীকার করে সায়মা বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে প্রতিষ্ঠানটি দক্ষ ও অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি জানান, ডব্লিউএইচও ছেড়ে গেলেও মানসিক স্বাস্থ্য, অটিজম এবং নিউরোডাইভারজেন্ট জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা রাখেন। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিকে আরও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করাও তাঁর অন্যতম লক্ষ্য বলে উল্লেখ করেন তিনি।
