বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আইন অঙ্গনের রাজনীতি: আত্মসমালোচনা, বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ করণীয়:
আমি রাজনীতি করি এবং বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে আইন পেশায় নিয়োজিত। স্বাভাবিকভাবেই আমার রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র বাংলাদেশের আইন অঙ্গন, সুপ্রিম কোর্ট এবং বিচারব্যবস্থা।
দীর্ঘদিন ধরে অনেক কথা বলতে চেয়েছি, অনেক কিছু লিখতে চেয়েছি। বিশেষ করে বাংলাদেশের আইন অঙ্গনে দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক সংগঠন, যে সংগঠনের নেতৃত্বে একটি দেশ স্বাধীন হয়েছে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দীর্ঘ প্রায় পনেরো বছর সাত মাসের সরকার পরিচালনার সময়কার সাফল্য-ব্যর্থতা, আমাদের নীতিনির্ধারণের দুর্বলতা এবং আইন ও বিচারব্যবস্থাকে ঘিরে আমাদের রাজনৈতিক কৌশলের সীমাবদ্ধতা নিয়ে বারবার লিখতে গিয়ে থেমে গেছি। অনেক কথা বলা হয়নি।
কিন্তু এখন মনে হচ্ছে—সময় এসেছে কথা বলার। সময় এসেছে লিখবার। কারণ আত্মসমালোচনা না করলে কোনো রাজনৈতিক সংগঠন তার ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারে না।
আমাদের অতীতের ভুল-ত্রুটি, ব্যর্থতা এবং সীমাবদ্ধতাগুলোকে আড়াল না করে সেগুলো চিহ্নিত করেই আগামী দিনের জন্য একটি সুসংগঠিত, বাস্তবভিত্তিক ও দূরদর্শী পথ নির্ধারণ করতে হবে। আমরা যদি না বলি, তরুণ প্রজন্ম যদি না বলে, তাহলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের কাছে আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনায়—বিশেষ করে বিচার বিভাগ ও আইন অঙ্গনকে কেন্দ্র করে—কী ধরনের নীতি, কাঠামো ও রাজনৈতিক কৌশল প্রয়োজন, সেই আলোচনা কীভাবে সামনে আসবে?
রাষ্ট্রের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের অন্যতম বিচার বিভাগ। রাষ্ট্র পরিচালনায় এর ভূমিকা মৌলিক। অথচ আওয়ামী লীগের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমা, বিশেষ করে বিচার বিভাগকে কেন্দ্র করে আমাদের রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে।
বিচার বিভাগ নিয়ে আমাদের আত্মসমালোচনা প্রয়োজন,
আমাদের নীতির বাস্তবায়নে কোথায় ঘাটতি ছিল, কোথায় সাংগঠনিক দুর্বলতা ছিল এবং কোথায় ব্যক্তিস্বার্থ দলীয় স্বার্থের ওপর প্রাধান্য পেয়েছে—এসব প্রশ্ন এখন নির্মোহভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ হলো, আইন অঙ্গনে আওয়ামী লীগের রাজনীতির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি সাংগঠনিক দুর্বলতা কাজ করেছে। যোগ্য, ত্যাগী ও রাজনৈতিকভাবে পরীক্ষিত আইনজীবীদের যথাযথভাবে মূল্যায়ন এবং সংগঠিত করার ক্ষেত্রে আমরা অনেক সময় ব্যর্থ হয়েছি।
অন্যদিকে, কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে সুবিধাবাদী বা ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান থেকে আসা ব্যক্তিদের দলীয় পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে দলীয়ভাবে নিরপেক্ষ পর্যালোচনা হওয়া প্রয়োজন। কারণ একটি রাজনৈতিক সংগঠনের শক্তি শুধু তার সংখ্যায় নয়; তার শক্তি নির্ভর করে তার কর্মীদের রাজনৈতিক কমিটমেন্ট, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, আদর্শের প্রতি আনুগত্য এবং সংকটের সময় দলের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতার ওপর।
২৪ এর ৫ আগস্টের পরের বাস্তবতা আমাদের নতুন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে-
৫ আগস্টের পর তাৎক্ষণিক বিচার অঙ্গনের বিভিন্ন স্তরে যে পরিবর্তন আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, তা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখেছে—প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও চাকরি রক্ষার সঙ্গে ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও সাংবিধানিক মূল্যবোধের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হবে?
এখানে কোনো ব্যক্তি বা পুরো বিচার বিভাগকে এককভাবে দায়ী করা উদ্দেশ্য নয়। বরং প্রশ্নটি প্রাতিষ্ঠানিক।
মানুষের মানবাধিকার, মৌলিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা এবং আইনের সমান প্রয়োগ—এসবই বিচারব্যবস্থার মৌলিক দায়িত্বের অংশ। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যদি বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে মানুষের আস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে সেটি শুধু কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
আইনজীবীদের ভূমিকা কোথায়?
বিচার বিভাগের দুটি অপরিহার্য অংশ—Bench এবং Bar।
বিচারকরা বিচার পরিচালনা করেন; আর আইনজীবীরা আদালতে ন্যায়বিচারের পক্ষে যুক্তি, আইন ও তথ্য উপস্থাপন করেন। তাই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচারের পরিবেশ রক্ষায় আইনজীবীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, সাংবিধানিক মূল্যবোধ ও আইনের শাসনে বিশ্বাস করেন, তাদের দায়িত্ব শুধু দলীয় রাজনীতি করা নয়। তাদের দায়িত্ব হলো আদালতে আইনের শাসনের পক্ষে দাঁড়ানো, অন্যায় হলে তার প্রতিবাদ করা এবং বিচারপ্রার্থী মানুষের অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ৫ আগস্টের পর আইন অঙ্গনে আমাদের পক্ষ থেকে তেমন কোনো সুসংগঠিত ও কার্যকর উদ্যোগ আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। বিচ্ছিন্নভাবে অনেকে কথা বলেছেন, ব্যক্তিগতভাবে অনেকে অবস্থান নিয়েছেন; কিন্তু একটি ঐক্যবদ্ধ, নীতিনির্ভর ও প্রাতিষ্ঠানিক আন্দোলন আমরা এখনো গড়ে তুলতে পারিনি।
এই জায়গাটিই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।
ব্যক্তিস্বার্থ বনাম রাজনৈতিক কমিটমেন্ট-
আইনজীবীদের একটি অংশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যে প্রবণতা আমি লক্ষ্য করেছি, তা হলো—দলীয় আদর্শ ও বৃহত্তর রাজনৈতিক লক্ষ্য থেকে ব্যক্তিগত অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। কে কোন পদ পাবেন, কে কার আগে যাবেন, কে কার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করবেন—এসব প্রতিযোগিতা যখন রাজনৈতিক আদর্শ ও সাংগঠনিক দায়িত্বকে ছাপিয়ে যায়, তখন একটি সংগঠন দুর্বল হতে বাধ্য। রাজনীতি কোনো ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার প্রকল্প নয়। বিশেষ করে আইনজীবীদের রাজনীতি শুধু পদ-পদবি বা পেশাগত সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হওয়া উচিত নয়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, সাংবিধানিক শাসন এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নে রাজনৈতিক কমিটমেন্ট থাকতে হবে।
নেতৃত্বের সংকট নয়, সঠিক নেতৃত্ব নির্বাচনের সংকট-
আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আইন অঙ্গনে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্য মানুষের অভাব নেই। সমস্যা নেতৃত্বের অভাব নয়; সমস্যা হলো সঠিক নেতৃত্বকে সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় বেছে নেওয়া। যারা দীর্ঘদিন রাজপথে ছিলেন, মামলা-মোকদ্দমা মোকাবিলা করেছেন, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, পেশাগত ও রাজনৈতিক জীবনে দলের পাশে থেকেছেন—তাদের রাজনৈতিক ও পেশাগত অবদানকে মূল্যায়ন করতে হবে।
একই সঙ্গে নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, গ্রুপিং, তদবির কিংবা সাময়িক সুবিধার পরিবর্তে যোগ্যতা, সততা, রাজনৈতিক কমিটমেন্ট, পেশাগত দক্ষতা এবং সাংগঠনিক গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
অনুপ্রবেশের অভিযোগও গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা প্রয়োজন-
রাজনৈতিক সংগঠনে অনুপ্রবেশের অভিযোগ নতুন নয়, আওয়ামী লীগের আইন অঙ্গনের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময়ে এমন অভিযোগ উঠেছে যে, ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান থেকে আসা কিছু ব্যক্তি সাংগঠনিক কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করেছেন। এ ধরনের অভিযোগ সত্য-মিথ্যা যাচাই করার দায়িত্ব দলীয় সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার। কিন্তু অভিযোগগুলোকে একেবারে উপেক্ষা করাও সমাধান নয়।
প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ, তথ্যভিত্তিক ও সাংগঠনিক মূল্যায়ন।
কে কখন দলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, সংকটের সময়ে কে কোথায় ছিলেন, কে কী ভূমিকা পালন করেছেন এবং কার রাজনৈতিক ও পেশাগত অবস্থান কী ছিল—এসব বিষয় তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা দরকার।
এখন কী করতে হবে?
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যদি ভবিষ্যতে আইন অঙ্গনে কার্যকরভাবে ঘুরে দাঁড়াতে চায়, তাহলে আত্মসমালোচনার পাশাপাশি প্রয়োজন—
এক. আইন অঙ্গনের সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন করা;
দুই. ত্যাগী, পরীক্ষিত ও যোগ্য আইনজীবীদের যথাযথভাবে
মূল্যায়ন করা;
তিন. নেতৃত্ব নির্বাচনে ব্যক্তিগত আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতা ও রাজনৈতিক কমিটমেন্টকে গুরুত্ব দেওয়া;
চার. আইনজীবীদের মধ্যে বিভাজন ও গ্রুপিং শুন্যের কোটায় এনে একটি ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা;
পাঁচ. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে সুস্পষ্ট নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করা;
ছয়. মানবাধিকার, মৌলিক অধিকার ও আইনের শাসনের বিষয়ে আইনজীবীদের সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করা;
সাত. তরুণ আইনজীবীদের সামনে এনে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরি করা;
আট. অতীতের ভুল, ব্যর্থতা ও সাংগঠনিক দুর্বলতা নিয়ে তথ্যভিত্তিক গবেষণা করা;
নয়. আইন ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নিজস্ব একটি গবেষণা সেল গঠনকরে আগামী ১০০ বছরে দেশের বিচার বিভাগের গতি প্রকৃতি নিয়ে সুস্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা প্রণয়ন করা;
দশ. দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি পেশাগত নৈতিকতা ও আদালতের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা ভাবেন, তাদের এখন শুধু অতীতের গৌরবের কথা বললে হবে না। নিজেদের ভুলের কথাও বলতে হবে।
কারণ যে দল নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে না, সে দল ভবিষ্যতের ভুল এড়াতে পারে না। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আইন অঙ্গনে এখনো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ আছে। কিন্তু সেই ঘুরে দাঁড়ানো হতে হবে নীতিকেন্দ্রিক, সাংগঠনিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক।
বিচার বিভাগকে ন্যায়বিচার, সংবিধান, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠান হিসেবে শক্তিশালী করতে হবে।
আর সেই কাজে Bar-এর আইনজীবীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি আইনজীবী সমাজ—যারা অন্যায়ের সামনে নীরব থাকবে না, ব্যক্তিস্বার্থের জন্য আদর্শ বিসর্জন দেবে না, সংকটে সহযোদ্ধাকে একা ফেলে যাবে না এবং আদালতের ভেতরে ও বাইরে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াবে। মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আইনজীবী সমাজ কে অবশ্যই সেই ব্রত নিয়ে কাজ করতে হবে।
আজ বিভাজন নয়— প্রয়োজন নিরঙ্কুশ ঐক্য।
ব্যক্তিস্বার্থ নয়—আদর্শ।
পদ-পদবি নয়—দায়িত্ববোধ।
অন্ধ আনুগত্য নয়— প্রয়োজন যুক্তিনির্ভর রাজনৈতিক কমিটমেন্ট।
সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন—অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য একটি সুস্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবভিত্তিক পথ নির্ধারণ করা।
আমি মনে করি, সেই আলোচনা এখনই শুরু হওয়া উচিত।
এস. আর. সিদ্দিকী সাইফ
সাবেক সহকারী এটর্নি জেনারেল,
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
