৮ মাসে ৩৬ নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধার, এখনো নিখোঁজ ২ হাজারের বেশি

অবশ্যই পরুন

দেশে শিশু নিখোঁজ, হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনায় উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নিখোঁজের পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় মোট ১৫৫ শিশুর নিহত হওয়ার তথ্য পেয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।


সম্প্রতি কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর মরদেহ উদ্ধার হয়। এর আগে চলতি বছর নিখোঁজ শিশুদের কারও মরদেহ মিলেছে মাটিচাপা অবস্থায়, আবার কারও মরদেহ উদ্ধার হয়েছে নদী বা জলাশয় থেকে।


আসকের হিসাবে, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত শিশুদের মধ্যে শারীরিক নির্যাতনে ৬৮ জন, পারিবারিক পরিসরে নির্যাতনে ৪৯ জন এবং ধর্ষণের পর ২৬ জন নিহত হয়েছে। এ ছাড়া ধর্ষণচেষ্টার পর ৪ জন, গুলিতে ৩ জন, গৃহকর্মী হিসেবে নির্যাতনের শিকার হয়ে ২ জন, উত্ত্যক্তকারীর হাতে ২ জন এবং অপহরণের পর ১ শিশু নিহত হয়েছে।


এর বাইরে আত্মহত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু ও মরদেহ উদ্ধারের ৯৯টি ঘটনার তথ্যও পেয়েছে সংগঠনটি। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে এসব পরিসংখ্যান তৈরি করেছে আসক।
নিখোঁজের পর হত্যার অভিযোগ
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাতেও শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার পর হত্যার অভিযোগ সামনে এসেছে। জামালপুরের মাদারগঞ্জে সাত বছরের এক শিশু ১০ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়ে যাওয়ার পর আর বাড়ি ফেরেনি। দুই দিন পর তার এক সহপাঠীর বাড়ির মেঝেতে মাটিচাপা অবস্থায় মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পাবনা সদরেও ১০ বছর বয়সী এক শিশু ৯ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হয়। সাত দিন পর ১৬ সেপ্টেম্বর একটি ডোবা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের দাবি, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।


পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও নিহত হচ্ছে শিশু:
শুধু নিখোঁজের পর হত্যাই নয়, পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে হত্যার শিকার হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত চারটি ঘটনায় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাত শিশুর নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।


২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে একটি ভাড়া বাসায় এক পরিবারের মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত তিন মেয়ের মধ্যে একজনের বয়স ছিল ১০ বছর।


আগস্টে রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশকেও হত্যা করা হয়। একই মাসে মাদারীপুরের শিবচরে এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের পাঁচ দিন পর নদী থেকে তাঁর এক বছর বয়সী সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, মা ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।
এ ছাড়া ১৮ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে একই পরিবারের ১০, ৭ ও ২ বছর বয়সী তিন শিশুকে হত্যার ঘটনা সামনে এসেছে।


আট মাসে ২ হাজারের বেশি হত্যা মামলা:
শিশুদের বাইরে দেশে হত্যাকাণ্ডের সামগ্রিক চিত্রও উদ্বেগজনক। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে দেশে ২ হাজার ৩৬২টি হত্যা মামলা হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২৯৫টি হত্যা মামলা হয়েছে।
এখনো নিখোঁজ ২ হাজার ৩৮ শিশু
শিশুহত্যার পাশাপাশি নিখোঁজের সংখ্যাও বড়। পুলিশ সদর দপ্তরের ৩ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হয়েছিল। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে।
সে হিসাবে এখনো ২ হাজার ৩৮ শিশু নিখোঁজ রয়েছে, যা মোট নিখোঁজ শিশুর প্রায় ১৩ শতাংশ।


শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ:
শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনায় সুরক্ষাব্যবস্থা ও জবাবদিহি জোরদারের দাবি উঠছে। গত ২২ মে শিশুদের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি দেয় ইউনিসেফ। সংস্থাটি দায়মুক্তির অবসান এবং ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের প্রতিটি পরিসরে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছিল।
অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা, শিশুবান্ধব পুলিশ ও বিচারপ্রক্রিয়া, স্থানীয় পর্যায়ে সুরক্ষা সেবা এবং মানসিক-সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল বলেন, শিশুদের বিরুদ্ধে এ ধরনের নৃশংসতা সমাজের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। খেলার মাঠ, বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যাওয়া কিংবা পরিবারের সঙ্গে থাকা—কোনো জায়গাতেই যদি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়, তাহলে তা গভীর সামাজিক উদ্বেগের বিষয়।


তাঁর মতে, শিশুদের ওপর সহিংসতার পেছনে অপরাধীদের বিকৃত মানসিকতার পাশাপাশি প্রতিশোধ, পারিবারিক বিরোধ কিংবা বড়দের দ্বন্দ্বের মতো কারণও থাকতে পারে। এসব অপরাধের দ্রুত বিচার ও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে সচেতনতা বাড়ার পাশাপাশি অপরাধ কমানোর ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে।

আরও নিবন্ধ

সর্বশেষ সংবাদ