২০০৪ সালের একুশে আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের জনসভায় নৃশংস গ্রেনেড হামলার পর তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকার তদন্তকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছিল। সেই ষড়যন্ত্রের প্রথম শিকার হয়েছিলেন কুমিল্লার মুরাদনগরের নিরীহ তরুণ শৈবাল সাহা পার্থ।
পার্থ ভারত থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে বাটা সিগন্যালের কাছে বোন পল্লবী সাহার বাসায় উঠেছিলেন। ২৫ আগস্ট এলিফ্যান্ট রোডের হার্ডনেট সাইবার ক্যাফে থেকে শেখ হাসিনাকে হত্যার হুমকি দিয়ে একটি দৈনিকে ই-মেইল পাঠানোর ঘটনাকে পুঁজি করে বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা তাকে বোনের বাসা থেকে ডেকে এনে আটক করে।
চার দিন অজ্ঞাত স্থানে আটকে নির্যাতনের পর ২৯ আগস্ট সিআইডি ইন্সপেক্টর তাকে আদালতে হাজির করেন। পর্যায়ক্রমে ১৪ দিনের রিমান্ডে মালিবাগ সিআইডি অফিসে নিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য বর্বর নির্যাতন চালানো হয়। টানা ২৪ ঘণ্টা চোখ কালো কাপড়ে বেঁধে বৈদ্যুতিক শক, লাঠিপেটাসহ পাকিস্তানি স্টাইলের নির্যাতন চলে। মোট ১৮ দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে তিনি এই নির্যাতনের শিকার হন।
তীব্র নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে পড়লে হাইকোর্ট তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তির নির্দেশ দেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রথমে অস্বীকৃতি জানালেও ২৭ সেপ্টেম্বর ২০০৪-এ তাকে ভর্তি করা হয়। পার্থের মা বেলারাণী সাহা ছেলের মুক্তির জন্য মন্দিরে রক্ত দিয়ে পূজা দেন। সেই ছবি তখন পত্রিকায় গুরুত্বসহকারে প্রকাশিত হয়।
ভারতে পড়াশোনা করায় তাকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর চর হিসেবে প্রচারের চেষ্টাও চালানো হয়। হাইকোর্টের নির্দেশে ১৫ মার্চ ২০০৫ জামিন পেয়ে সাত মাস পর ২৩ মার্চ কারাগার থেকে মুক্তি পান পার্থ। মুক্তির পর তিনি জানান, টানা পাঁচ দিন চোখ বেঁধে ব্যাপক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়েছিল।
তদন্তে দেখা যায়, ওই সাইবার ক্যাফেতে একই আইপি থেকে ২১টি পিসি ব্যবহৃত হয়েছিল। পার্থ যে ই-মেইল পাঠিয়েছিলেন, তার কোনো জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরে প্রকাশ পায়, নারায়ণগঞ্জের যমজ ভাই জঙ্গি মুরসালিন ও মুত্তাকিন (জেএমবি নেতা) ওই ক্যাফে থেকে মেইল করেছিলেন। ২০০৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নয়াদিল্লিতে অস্ত্রসহ গ্রেফতার হয়ে তারা এখন ভারতের তিহার জেলে বন্দি।
একুশে আগস্ট হামলার পর গঠিত বিচারপতি জয়নুল আবেদিন কমিশন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দিয়েছিল। তৎকালীন কর্তাব্যক্তিরা পার্থের ধর্মীয় পরিচয় ও ভারতে পড়াশোনার সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাকে হামলাকারী হিসেবে সাজানোর চেষ্টা করেন। সাজানো জবানবন্দি আদায়ের অংশ হিসেবে জজ মিয়ার পরিবারকে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন নিয়মিত মাসোহারা দিতেন বলে পরে প্রকাশ পায়। জজ মিয়ার আগে অন্তত আরও বিশজনকে আটক করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে একুশে আগস্ট মামলার রায়ে নির্দোষ প্রমাণিত হন শৈবাল সাহা পার্থ। তদন্তের এই নগ্ন বিকৃতি ও নিরীহ মানুষের ওপর চালানো নির্যাতন আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয়।
