বাংলাদেশে আবারও সন্ত্রাসবিরোধী আইনকে রাজনৈতিক দমনপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (Human Rights Watch)। ৮ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে, সরকার সম্প্রতি সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংশোধনী এনে তার ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেছে, যার ফলে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক, ও সমালোচকদের বিরুদ্ধে এই আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে। সংস্থার ভাষায়, “এই আইন এখন এমন এক অস্ত্র হয়ে উঠেছে যা রাজনৈতিক ভিন্নমতকে দমন করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।”
২০০৯ সালে প্রণীত সন্ত্রাসবিরোধী আইন মূলত জঙ্গি কার্যক্রম ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের সংশোধনের পর এর সংজ্ঞা ও প্রয়োগ ক্ষেত্র এতটা বিস্তৃত করা হয়েছে যে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা, এমনকি রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের মতো কাজও এখন ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে গণ্য হতে পারে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, এই পরিবর্তন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে এমন ক্ষমতা দিয়েছে যা তারা নির্বিচারে গ্রেফতার, নির্যাতন এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ব্যবহার করতে পারছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হাজার হাজার আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা, কর্মী ও সমর্থক গ্রেফতার হয়েছেন শুধুমাত্র রাজনৈতিক আলোচনায় অংশ নেওয়া বা সমাবেশ আয়োজনের কারণে। কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি ও সাংবাদিককেও ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন’-এর আওতায় গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তাদের আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি, চিকিৎসা থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে। আদালতে তোলা হলে অভিযুক্তদের বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, হেলমেট ও হ্যান্ডকাফ পরিয়ে আনা হয় যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুস্পষ্ট উদাহরণ।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, বাংলাদেশ সরকার নতুন সংশোধনের মাধ্যমে এমন বিধান যুক্ত করেছে, যার ফলে কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সভা-সমাবেশ, প্রকাশনা বা অনলাইন কার্যক্রম সহজেই ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষণা করা যায়। এর ফলে সরকারের সমালোচক ও বিরোধী দলের কর্মীরা ভয়ের মধ্যে আছেন, কারণ যে কোনো সময় তাদের শান্তিপূর্ণ কাজকেও “রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড” হিসেবে দেখিয়ে মামলা দেওয়া হতে পারে।
সংস্থাটি আরও উল্লেখ করেছে যে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর হাতে এখন এমন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে থেকেও মানুষকে গ্রেফতার ও আটক রাখার সুযোগ তৈরি করেছে। এতে করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ন্যায্য বিচারের অধিকার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের সম্পাদক পরিষদ ও নাগরিক সমাজও এর আগে সতর্ক করেছিল যে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের এই সংশোধন সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য ভয়াবহ হুমকি তৈরি করবে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহার করে কার্যত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমন করছে। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘনের শামিল। সংস্থাটি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আহ্বান জানিয়েছে, তারা যেন বাংলাদেশে এই আইন অপব্যবহারের বিষয়ে নজরদারি বাড়ায় এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা গ্রেফতারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার নামে এমন আইনের বিস্তৃত ক্ষমতা আসলে একধরনের স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করছে। এতে বিচারব্যবস্থা দুর্বল হচ্ছে, ভিন্নমত দমন করা সহজ হচ্ছে এবং জনগণের মৌলিক অধিকার বিশেষত মতপ্রকাশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা বলেন, যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তবে আগামী জাতীয় নির্বাচনও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে, কারণ বিরোধী পক্ষ ও সমালোচকদের কণ্ঠ রুদ্ধ থাকলে গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা বাস্তবে সম্ভব নয়।
অবশেষে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ স্পষ্ট করে বলেছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনকে প্রকৃত নিরাপত্তা রক্ষার জন্য ব্যবহার না করে সরকার এখন সেটিকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ ও ভয় দেখানোর যন্ত্রে পরিণত করেছে। তারা আহ্বান জানিয়েছে, বাংলাদেশ যেন এই আইনের অপব্যবহার বন্ধ করে, আটককৃতদের মুক্তি দেয়, এবং জনগণের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার পুনঃস্থাপন করে।
