যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকের ভেতরে পাশাপাশি রাখা ছিল দুইটি মরদেহ একটি ২২ বছর বয়সী কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালীর, অন্যটি তাঁর নয় মাস বয়সী শিশু সন্তান সেজাদ হাসান নাজিফের। শনিবার সন্ধ্যায় বাগেরহাট থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে যশোর কারাগারে আনা হয় মা ও শিশুর মরদেহ। সেখানেই কারাবন্দি বাবা জুয়েল হাসান সাদ্দাম শেষবারের মতো স্ত্রী ও সন্তানকে দেখার সুযোগ পান।
কারারক্ষীদের উপস্থিতিতে মাত্র কয়েক মিনিটের সেই সাক্ষাতে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি সাদ্দাম। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্তানকে কোলে নিতে না পারার আক্ষেপে ভেঙে পড়েন তিনি। শিশুর নিথর দেহ ছুঁয়ে বাবার কণ্ঠে ছিল অপরাধবোধ আর অনুতাপ। একইভাবে স্ত্রীর প্রতিও ক্ষমা প্রার্থনা করেন তিনি।
সাদ্দামের ভাই শহিদুল ইসলাম জানান, কারাফটকের ভেতর থেকে দুই মুঠো মাটি সংগ্রহ করে পরিবারের হাতে দেন সাদ্দাম। একটি স্ত্রীর কবরের জন্য, অন্যটি সন্তানের কবরের জন্য। সেই দৃশ্য উপস্থিত স্বজনদের চোখে পানি এনে দেয়।
এর আগে শুক্রবার দুপুরে বাগেরহাট সদরের সাবেকডাঙ্গা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে স্বর্ণালী ও তাঁর শিশুসন্তানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘরের ভেতরে স্বর্ণালীর মরদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় এবং শিশুটিকে বাথরুম থেকে উদ্ধার করা হয়। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকেরা জানান, শিশুটির মৃত্যু আগেই হয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে একাধিক ।মিথ্যা মামলায় কারাবন্দি থাকায় সাদ্দামের স্ত্রী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। স্বামীর সঙ্গে নিয়মিত দেখা না হওয়া এবং অনিশ্চয়তা তাঁকে আরও হতাশ করে তোলে বলে দাবি তাঁদের।
স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর পর সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার দাবিতে পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করা হয়। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এ বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো লিখিত আবেদন পাওয়া যায়নি। যদিও মানবিক বিবেচনায় কারাগারের ফটকে মরদেহ দেখার ব্যবস্থা করা হয়।
যশোর জেলা প্রশাসন ও কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, নিয়ম অনুযায়ী বন্দি যে জেলায় আটক আছেন, সেই জেলার প্রশাসনের কাছেই প্যারোল–সংক্রান্ত আবেদন করতে হয়। এ ঘটনায় কোনো আনুষ্ঠানিক আবেদন না থাকায় প্যারোল দেওয়ার সুযোগ হয়নি।
এদিকে স্বর্ণালীর বাবা মো. রুহুল আমিন বাগেরহাট সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। তাঁর দাবি, মেয়ের মৃত্যু আত্মহত্যা হলেও শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি রহস্যজনক। পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শনিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে বাগেরহাট সদরের সাবেকডাঙ্গা গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে মা ও শিশুকে পাশাপাশি দাফন করা হয়। এর আগে স্থানীয় ঈদগাহ মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
ন্যাশনিক্স/এলকে
