বাংলাদেশে ‘মব জাস্টিস’ বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার দ্বারা পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় এক চরম বিচারহীনতার চিত্র ফুটে উঠেছে। সম্প্রতি এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ১৩ মাসে সারাদেশে ৪৬টি গণপিটুনির ঘটনায় মোট ৬৭ জনের মৃত্যু হলেও, এসব মামলার বিচারিক অগ্রগতি এবং আসামি গ্রেপ্তারের হার হতাশাজনকভাবে কম। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, গণপিটুনির ৪৬টি ঘটনার মধ্যে ৩৬টিতে মামলা হলেও প্রায় ৯ হাজারেরও বেশি (অজ্ঞাতনামা সহ) আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে মাত্র ১১৪ জন। অর্থাৎ, গ্রেপ্তারের হার মাত্র ১.২ শতাংশ। এমনকি ৯টি মামলায় একজন অভিযুক্তকেও গ্রেপ্তার করা যায়নি।
উদাহরণস্বরূপ, মাগুরার মহম্মদপুরে মোবাইল চুরির অভিযোগে ইসরাফিল নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ২৮ জনকে আসামি করে মামলা হলেও কেউ গ্রেপ্তার হননি। একইভাবে, চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে চোর সন্দেহে ১৫ বছর বয়সী রিহান মাহিনকে পিটিয়ে মারা হলেও জড়িতদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া চলছে ঢিমেতালে। মাহিনের মা-এর ভাষায়, তাঁর সন্তান একটু পানি চাইলেও তারা দেয়নি,এই নির্মমতা আমাদের সমাজের মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়কে স্পষ্ট করে তোলে।বিশেষজ্ঞ এবং মানবাধিকার কর্মীরা এই বিচারহীনতার জন্য একাধিক কারণকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, আইন ও বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং অনাস্থা সাধারণ মানুষকে হতাশ করে তুলছে, যার ফলে তারা নিজেই আইন হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত হচ্ছে। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল মন্তব্য করেছেন, মব-সন্ত্রাস দমনে পুলিশের নৈতিক অবস্থান দুর্বল ছিল, যা এমন ঘটনাগুলোকে আরও উস্কে দিয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, যখন সাক্ষী, বিচারক এবং শাস্তিদাতা,সবকিছুই উচ্ছৃঙ্খল জনতা হয়, তখন সেখানে কোনো ন্যায়বিচার হয় না। এটি সংবিধানের মৌলিক অধিকার, বিশেষ করে আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারের (২৭ অনুচ্ছেদ) পরিপন্থী।
জাতিসংঘের মানবাধিকার সংক্রান্ত বৈশ্বিক ঘোষণা অনুযায়ী, মব-সহিংসতা মানবাধিকারের বড় ধরনের লঙ্ঘন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে পুলিশের কম তৎপরতা, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেতে দেরি হওয়া, এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের পক্ষ থেকে মামলার জন্য অনিচ্ছুক থাকা।এই পুরো প্রক্রিয়ায় এক ধরনের বিচারহীনতার চক্র তৈরি করেছে, যা গণপিটুনির মতো জঘন্য অপরাধের পুনরাবৃত্তিকে উৎসাহিত করছে।
