গত শুক্রবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ঘটে যাওয়া নির্মম ঘটনার শিকার হয়েছেন বিআইডব্লিউটিএ’র ইলেকট্রিশিয়ান আনোয়ার হোসেন (বাবু)। স্থানীয়দের অভিযোগ তার উপর চোর সন্দেহ তাঁকে ধরে হাত-পা বেঁধে রড দিয়ে পিটানো হয়; পরে তিনি মারা যান। নিহতের স্ত্রী ও দুই কন্যা রেখে গেছেন তিনি; আত্মীয়রা বলছেন আনোয়ার কোনো চুরি করেনি তিনি যোগ্য কর্মী হিসেবে সংসার চালাতেন।
আনোয়ারের মা দিলরুবা আক্তার ঘটনার পর করুণ আর্তনার সুরে বলেন, “আমার পোলা তো চোর ছিল না। রাস্তা থেকে ধরে ওরা পোলাডার কষ্ঠ করে মারছে আমি তার বিচার চাই।” পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার পর পুলিশ অভিযোগ গ্রহণ করে মামলা প্রক্রিয়াধীন রেখেছে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর করা মাসিক পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কিংবা সন্দেহভাজন হিসেবে গণপিটুনি ও মব সন্ত্রাসের ঘটনা বেড়েছে। এক সংস্থা বলেছে গত সেপ্টেম্বর থেকে গত অক্টোবর পর্যন্ত ১৪ মাসে গণপিটুনিতে অন্তত ২১৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন; একই সময়ে আহত হয়েছেন ২৭৫ জন। আরেকটি সংস্থার উপাত্ত দেখায় গত ১৩ মাসে অন্তত ২০৪ জন নিহত হয়েছে এবং শুধু গত অক্টোবরে ১২ জন নিহত হয়েছেন এইসব তথ্যগুলো মব হিংসার বহুমাত্রিকতা ওীর ভয়াবহতা ফুটিয়ে তোলে।
পুলিশ প্রধান (আইজিপি) বাহারুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মব ভায়োলেন্স নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে; অপরাধ করলে পার পাওয়া যাবে না কিন্তু পুলিশের একার পক্ষে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন; সবার সম্মিলিত প্রয়াস দরকার।’ পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি–সেপ্টেম্বর সময়ে পুলিশের ওপর মব সন্ত্রাস, হামলা ও হেনস্তার ৪৬২টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে; এর মধ্যে বড় ধরনের ৭০টি ঘটনা রয়েছে।
পূর্ববর্তী অভিজ্ঞ IGP নুরুল হুদা মন্তব্য করেছেন, মব সন্ত্রাস বেড়েছে ও নিরপরাধ ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা আইনের দৃষ্টিতে চরম অপরাধ। এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নিলে ঘটনা বাড়তেই থাকবে। সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, গণপিটুনি মব-হিংসারই একটি রূপ; কোনোভাবেই নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া বৈধ নয়। তিনি আরও যোগ করেন, রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত শত্রুতা, আর্থিক বিবাদ ইত্যাদি অজুহাতে কিছু মহল জনগণের ক্ষোভকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাজে লাগিয়ে থাকে কোনো অভিযোগ থাকলে তার উপযুক্ত ন্যায়বিচারের জন্য দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা কার্যকর করা উচিত।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নির্বাহী ও বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রতিক ঘটনা (যেমন গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে তিনজনকে চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা, রাজধানীর তুরাগে নিরাপত্তাকর্মী আব্দুল মান্নানকে পিটিয়ে হত্যা প্রভৃতি) একই ধাঁচের এবং এগুলো মব সন্ত্রাসের বৃদ্ধি নির্দেশ করে। তারা মনে করান, এর পেছনে ঝুঁকি হলো অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার না হলে, বিচার না হলে সমাজে সহিংসতার সংস্কৃতি বৈধ হয়ে উঠতে পারে।
সমাধানের পথ হিসেবে পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপ, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কড়া আদালতি ব্যবস্থা, স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয়তা, এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এই সব মিলেই মব সন্ত্রাস কমানো সম্ভব। বেসরকারি এবং সরকারি পর্যায়ে হতাহত পরিবারদের উপর অর্থনৈতিক ও মানসিক সহায়তা প্রদানে উদ্যোগ নেয়া হলে ক্ষতিবোধ সামলাতে সহায়তা মিলবে এটিও পুনরাবৃত্তি রোধের একটি দিক।
ন্যাশনিক্স/এপি
