দেশের এলপিজি বাজারে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে অস্থিরতা চলছে। সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন এলাকায়। কোথাও সিলিন্ডার মজুত থাকার পরও ক্রেতাদের কাছে বিক্রি না করার অভিযোগ রয়েছে।
এর মধ্যেই রোববার সন্ধ্যা ৬টা থেকে বেসরকারি খাতের ১২ কেজির এলপিজির নতুন দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। আগের দামের তুলনায় এটি ২৫২ টাকা বেশি। তবে নতুন দর কার্যকর হওয়ার পরও বাজারে সরবরাহ সংকট ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন এলাকার বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মুন্সীগঞ্জে ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। ময়মনসিংহে দাম ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২ হাজার ৫০০ টাকাও নেওয়া হচ্ছে।
কুমিল্লায় প্লাস্টিকের সিলিন্ডার ২ হাজার ১৫০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা এবং স্টিলের সিলিন্ডার প্রায় ১ হাজার ৯৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে। বগুড়ায় নতুন দাম ঘোষণার পর কয়েকটি দোকানে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রাজশাহীর কাজলা ও ভদ্রা এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৯৫০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সেখানেও সরবরাহ কম বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। চারঘাটের কয়েকটি দোকানে গ্যাস নেই বলে জানানো হলেও সেখানে সিলিন্ডার মজুত দেখা গেছে বলে অভিযোগ করেছেন ক্রেতারা।
বরিশালে নতুন দর কার্যকর হওয়ার আগেই ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। স্থানীয় বিক্রেতারা জানান, চাহিদার তুলনায় তারা পর্যাপ্ত সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাইকারি পর্যায়েই ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে।
রংপুরেও সাম্প্রতিক সময়ে এলপিজির দাম বেড়েছে। সেখানে ওমেরা ব্র্যান্ডের সিলিন্ডার ১ হাজার ৯৪০ টাকা এবং আইগ্যাস ১ হাজার ৮২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। কয়েক দিন আগেও এসব সিলিন্ডারের দাম ছিল যথাক্রমে ১ হাজার ৬২০ ও ১ হাজার ৫৪০ টাকা। এক বিক্রেতার দাবি, আগে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি সিলিন্ডার বিক্রি হলেও বর্তমানে চার-পাঁচটির বেশি বিক্রি হচ্ছে না।
গাইবান্ধার ছোট বিক্রেতারাও সরবরাহ সংকটের কথা জানিয়েছেন। একটি ডিলার প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, সামনে কত পরিমাণ সিলিন্ডার সরবরাহ করা হবে, সে বিষয়ে কোম্পানির কাছ থেকে তারা নিশ্চিত তথ্য পায়নি।
এলপিজির বাড়তি দামের প্রভাব পড়েছে বাণিজ্যিক ব্যবহারকারীদের ওপরও। ময়মনসিংহে ৩০ ও ৪৫ কেজির সিলিন্ডার নির্ধারিত দামের চেয়ে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। একটি রেস্তোরাঁয় মাসে প্রায় ২০টি বড় সিলিন্ডার প্রয়োজন হওয়ায় অতিরিক্ত দামের কারণে তাদের মাসিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এদিকে অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রি ও অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। মুন্সীগঞ্জে একটি এলপিজি বিক্রেতাকে অতিরিক্ত দামে বিক্রির দায়ে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। গাইবান্ধায় তিনটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৮ হাজার ৫০০ টাকা এবং বরিশালে দুটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
সাভারের আশুলিয়ায় অভিযানে একটি প্রতিষ্ঠানকে ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত চালানের তথ্যের অসংগতির কারণে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রি, বড় সিলিন্ডার থেকে ছোট সিলিন্ডারে গ্যাস স্থানান্তর এবং সিলিন্ডারে পানি দেওয়ার অভিযোগে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এলপিজি সংকটের প্রভাব পরিবহন খাতেও পড়েছে। পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের লিংক রোড এলাকায় সিএনজি চালকেরা প্রায় দুই ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করেন। পরে প্রশাসন ও পুলিশের আশ্বাসে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
বিইআরসি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি আরামকোর অক্টোবরের প্রোপেন ও বিউটেনের সৌদি কনট্রাক্ট প্রাইসের ভিত্তিতে এলপিজির নতুন দাম সমন্বয় করা হয়েছে। অক্টোবরে প্রোপেনের দাম প্রতি টন ৬৮০ ডলার এবং বিউটেনের ৭৩০ ডলার ধরা হয়েছে। ৩৫:৬৫ অনুপাতে হিসাব করে গড় সৌদি কনট্রাক্ট প্রাইস নির্ধারণ করা হয়েছে ৭১২ দশমিক ৫০ ডলার।
সেপ্টেম্বরে এই গড় মূল্য ছিল ৬৪৭ দশমিক ৭৫ ডলার। অর্থাৎ এক মাসে প্রতি টনে গড় মূল্য বেড়েছে ৬৪ দশমিক ৭৫ ডলার। পাশাপাশি অক্টোবরের মূল্য নির্ধারণে এলপিজি আমদানির জাহাজ ভাড়া ও ব্যবসায়ীর প্রিমিয়াম প্রতি টনে ২৫০ ডলার বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, যা আগের মাসে ছিল ১৬০ ডলার।
অন্যদিকে সরকারি কোম্পানির ১২ দশমিক ৫ কেজির এলপিজির দাম ৮২৫ টাকা অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে সরবরাহ সীমিত হওয়ায় অধিকাংশ সাধারণ ভোক্তার জন্য এই দামে সরকারি সিলিন্ডার পাওয়া কঠিন বলে জানা গেছে।
বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির দাবি, ২০ সেপ্টেম্বরের পর আমদানিকারকেরা সরবরাহ প্রায় ৮০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছেন। ২৫ সেপ্টেম্বরের পর কয়েকটি ডিপো থেকেও সরবরাহ বন্ধ হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ।
তবে আমদানিকারকেরা কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকে তারা আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম ও জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাদের দাবি, বিইআরসির নির্ধারিত দামেই তারা পরিবেশকদের কাছে গ্যাস সরবরাহ করছেন এবং অনিয়ম হয়ে থাকলে তা পরিবেশক বা খুচরা পর্যায়ে হতে পারে।
সরবরাহ পরিস্থিতি যাচাই করতে সেপ্টেম্বর মাসের আমদানি ও বিক্রির তথ্য চেয়ে ১২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কাছে চিঠি দিয়েছে বিইআরসি। রোববার পর্যন্ত পাঁচটি প্রতিষ্ঠান তথ্য জমা দিয়েছে। বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, আমদানি ও বিক্রির তথ্য পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ন্যাশনিক্স/এলকে
