গ্যাস সরবরাহ কমেছে, বেড়েছে লোডশেডিং

অবশ্যই পরুন

দেশে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে। আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ গত কয়েক দিনে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে শিল্পে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনেও তৈরি হয়েছে ঘাটতি। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাড়ছে লোডশেডিং।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২৫ আগস্ট দুপুর ২টায় দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২৩৮ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে ১৬১ কোটি ৬০ লাখ এবং এলএনজি থেকে ৭৬ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট সরবরাহ করা হয়। ২৬ আগস্ট সরবরাহ কিছুটা বেড়ে মোট ২৪১ কোটি এবং এলএনজি ৭৯ কোটি ঘনফুটে পৌঁছায়।

এরপরই সরবরাহ কমতে শুরু করে। ২৭ আগস্ট বিকেল ৪টায় মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে ২৩৫ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুটে। এলএনজি সরবরাহ কমে হয় ৭৩ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট। ২৮ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় মোট সরবরাহ আরও কমে দাঁড়ায় ২৩৩ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট। এ সময় এলএনজি সরবরাহ ছিল ৭২ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট।

অর্থাৎ, ২৬ আগস্টের তুলনায় দুই দিনে মোট গ্যাস সরবরাহ কমেছে ৭ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট। শুধু এলএনজি সরবরাহ কমেছে ৬ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট।

সরকারি হিসাবে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। তবে খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত চাহিদা ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ কোটি ঘনফুট। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান এখনো বড়।

সামনে আরও কমতে পারে গ্যাস সরবরাহ

গ্যাস সরবরাহ কমার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় এলএনজি কার্গো পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। উচ্চমূল্য এবং সরবরাহকারীদের কম সাড়ার কারণে চাহিদা অনুযায়ী কার্গো সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

আগামী কয়েক দিনের দুটি এলএনজি কার্গো নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। এগুলো সময়মতো দেশে না এলে গ্যাস সরবরাহ আরও কমতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মহেশখালীর সামিট ও এক্সিলারেটের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে গেলে গ্যাস সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগে। পরে ২২ আগস্ট একটি কার্গো আসার পর টার্মিনালটি আবার সরবরাহ শুরু করে।

শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতে। জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ থেকেই গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে যায়। কোথাও দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে যাচ্ছে, আবার কোথাও কয়েক ঘণ্টার বেশি কারখানা চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

গাজীপুরের মোশাররফ কম্পোজিট টেক্সটাইলে স্বাভাবিক সময়ে দিনে প্রায় ১৭০ টন সুতা উৎপাদন হলেও গ্যাস সংকটে তা নেমে এসেছে মাত্র ৩০ শতাংশে। এতে এক মাসে প্রতিষ্ঠানটির ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫ কোটি টাকা।

নরসিংদীর একটি বস্ত্রকল গ্যাসের অভাবে টানা ২২ দিন বন্ধ ছিল। নারায়ণগঞ্জের একটি ডাইং কারখানায় ১৮ আগস্ট থেকে গ্যাস না থাকায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে প্রায় ৬৬০টি বস্ত্রকল তীব্র গ্যাস সংকটে রয়েছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৩০০ পোশাক কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

শিল্পমালিকদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক না হলে উৎপাদনের পাশাপাশি রপ্তানিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতা হারানোর ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন

গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সিএনজি স্টেশনগুলোতেও দেখা দিয়েছে ভোগান্তি। বিভিন্ন এলাকায় স্টেশনের সামনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। কোথাও গ্যাস নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

এতে পরিবহন খাতে সময় ও ব্যয়—দুটিই বাড়ছে। গ্যাসের চাপ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এই ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গ্যাস কমেছে বিদ্যুৎকেন্দ্রেও

শিল্প খাতের সংকট সামাল দিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও তা কমিয়ে ৭৫ কোটি ঘনফুট করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সাশ্রয় হওয়া প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস শিল্পে দেওয়ার কথা।

তবে এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গ্যাসের পাশাপাশি জ্বালানি তেল ও কয়লার সংকটও বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ বাড়াচ্ছে।

বৃহস্পতিবার ২৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি তেলের সরবরাহে ঘাটতি ছিল। কয়লাভিত্তিক আটটি কেন্দ্রের সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট হলেও ওই দিন উৎপাদন হয়েছে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কম।

পায়রার একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটিতে, মাতারবাড়ীর একটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণে এবং বড়পুকুরিয়ার দুটি ইউনিট ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে। কয়লা সরবরাহে বিঘ্নের কারণে আদানির কেন্দ্রও ৭ আগস্ট থেকে উৎপাদন কমিয়েছে।

লোডশেডিংয়ে বাড়ছে ভোগান্তি

গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের সংকটে বৃহস্পতিবার ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুতের ঘাটতি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।

২৪ আগস্ট দিনের বেলায় সর্বোচ্চ ঘাটতি ছিল ১ হাজার ১৯৩ মেগাওয়াট। ২৫ আগস্ট বিকেল ৩টায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ২৫৯ মেগাওয়াটে। ২৬ আগস্ট রাত ১২টায় ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৮২৮ মেগাওয়াট।

বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় ঘাটতি আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াটে। রাতেও ঘাটতি ছিল ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।

রাত ১টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ১৭১ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৯২৭ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট। রাত ৩টায় ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৯০ মেগাওয়াট।

শুক্রবার ভোর ৪টায় ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৯১৫ মেগাওয়াট এবং সকাল ৬টায়ও ২ হাজার ৬৩৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। তবে বিকেল ৩টায় ঘাটতি কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৮৩ মেগাওয়াটে।

গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহের এই সংকট কতদিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। প্রয়োজনীয় এলএনজি কার্গো সময়মতো না এলে গ্যাস সংকটের পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ সরবরাহ—দুই ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আরও নিবন্ধ

সর্বশেষ সংবাদ