নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে তীব্র গ্যাস সংকটে বিপাকে পড়েছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। টানা তিন দিন ধরে জেলার শতাধিক কারখানা বন্ধ রয়েছে। উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ না রাখতে অন্তত ৫০টি কারখানা গ্যাসের বিকল্প হিসেবে কাঠ পুড়িয়ে বয়লার চালানোর চেষ্টা করছে। এতে একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে কমে গেছে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা।
চৌয়ালা শিল্প এলাকার বিভিন্ন কারখানা ঘুরে দেখা গেছে, গ্যাসের চাপ কম থাকায় অধিকাংশ টেক্সটাইল, ডাইং ও সাইজিং কারখানা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে সীমিত আকারে উৎপাদন চালু রেখেছে, সেগুলোর উৎপাদন কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত। কোনো কোনো কারখানা স্বাভাবিক সক্ষমতার মাত্র ১০ শতাংশ নিয়ে চলছে।
সুতা প্রক্রিয়াজাতকারী সাইজিং কারখানাগুলো স্টিম বয়লার চালাতে কাঠ ব্যবহার করছে। একটি কারখানায় প্রতিদিন কাঠের পেছনেই ১০ হাজার টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। হক টেক্সটাইলের বয়লার অপারেটর মো. শাখাওয়াত জানান, আগে ঝুটকাপড় দিয়ে বয়লার চালানো হলেও এর দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন কাঠ ব্যবহার করতে হচ্ছে।
চৌয়ালা টেক্সটাইল শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসলাম ফকির বলেন, গ্যাস ছাড়া সাইজিং ও ডাইং কারখানা চালানো প্রায় অসম্ভব। তাঁর দাবি, গত তিন দিনে উৎপাদন বন্ধ থাকায় নরসিংদীর শিল্প খাতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে।
উৎপাদন কমেছে ব্যাপকভাবে
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাবে, নরসিংদীতে ছোট-বড় মিলিয়ে চার হাজারের বেশি শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় তিন হাজার কারখানা টেক্সটাইল, ডাইং, সাইজিং, স্পিনিং ও তৈরি পোশাক খাতের। প্রায় ৪০০ কারখানা সরাসরি গ্যাসনির্ভর।
এসব কারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য ১০ থেকে ১৫ পিএসআই চাপের নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ প্রয়োজন। আগস্টের প্রথম সপ্তাহ থেকেই গ্যাস সংকট দেখা দিলেও গত তিন দিনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
মোমিন টেক্সটাইলের সাত ইউনিট বন্ধ
চৌয়ালা শিল্প এলাকার পুরোনো ও বড় প্রতিষ্ঠান মোমিন টেক্সটাইল মিলের ১০টি ইউনিটের সাতটিই গ্যাস সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে।
রপ্তানিমুখী এই প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন ২২ থেকে ২৩ হাজার ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৮ থেকে ১০ হাজার ঘনফুট। শ্রীলঙ্কা ও ভিয়েতনামে কাপড় রপ্তানি করা প্রতিষ্ঠানটির দৈনিক ২৫ লাখ গজ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ২০ হাজার গজে।
ফলে কারখানাটির আড়াই হাজার শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। তবে শ্রমিকদের ধরে রাখতে বেতন চালু রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
মোমিন টেক্সটাইল মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদুর রহমান বলেন, বিদেশি ক্রেতাদের প্রায় ২০ লাখ গজ কাপড়ের অর্ডার এখনো বাকি রয়েছে। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে সেগুলো সময়মতো উৎপাদন করা যাচ্ছে না।
গ্যাসের বিকল্প হিসেবে এলপিজি ব্যবহারের কথা ভাবছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এতে প্রতি গজ কাপড় উৎপাদনে খরচ অন্তত আড়াই টাকা বাড়বে। তাঁর আশঙ্কা, দ্রুত গ্যাস সংকটের সমাধান না হলে শিল্প খাতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠাচ্ছে কারখানা
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোতেও। আল মদিনা টেক্সটাইল মিলের স্বত্বাধিকারী মো. ইরতাজুল ইসলাম জানান, সাইজিং মিল বন্ধ থাকায় তাঁর কারখানায় প্রয়োজনীয় সুতা পাওয়া যাচ্ছে না।
একসময় তাঁর কারখানায় প্রতিদিন প্রায় এক লাখ গজ কাপড় উৎপাদন হলেও এখন ৩০ হাজার গজও উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। উৎপাদন কমে যাওয়ায় দুই শিফটের পরিবর্তে এক শিফটে কাজ চলছে। একই সঙ্গে ১৫০ শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ১০০ জনকে ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চাহিদার অর্ধেকেরও কম গ্যাস সরবরাহ
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনের নরসিংদী কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহক, ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানা কমপ্লেক্স এবং শিল্পকারখানায় জেলায় মাসিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১৩ কোটি ঘনমিটার। কিন্তু চলমান সংকটে সরবরাহ নেমে এসেছে চাহিদার অর্ধেকেরও নিচে।
তিতাসের নরসিংদী কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মো. মাকসুদুর রহমান বলেন, সংকটের কারণে কারখানাগুলোকে তাদের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে আগামী সপ্তাহে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
গ্যাস সরবরাহে দ্রুত স্বাভাবিকতা না ফিরলে নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন আরও কমে যাওয়া, শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠানো এবং রপ্তানি আদেশ পূরণে ব্যর্থতার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
