মেট্রোরেল লাইন-১ প্রকল্পে ব্যয় বাড়ছে ৬৮ হাজার কোটি টাকা

অবশ্যই পরুন

দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল, বিমানবন্দরের সঙ্গে কমলাপুরকে সংযুক্ত করা এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের ব্যয় ১২৯ দশমিক ৮২ শতাংশ বাড়িয়ে ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)।

প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের পর এটি হবে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প। সংশোধিত এই ব্যয় উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বর্তমানে চালু মেট্রোরেলের মোট ব্যয়ের প্রায় চারগুণ।

ডিএমটিসিএল ও পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দরপত্র প্রক্রিয়ায় ঠিকাদারদের প্রস্তাবিত দর প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। এর পাশাপাশি মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং বৈশ্বিক ও দেশীয় বাজারে মূল্যস্ফীতিও ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর একনেক সভায় অনুমোদিত ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ছিল ৫২ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।

গত মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) ডিএমটিসিএল পরিকল্পনা কমিশনে প্রথম সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এতে প্রকল্পের মেয়াদ ২০৩৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

সংশোধিত প্রস্তাবে জাপানি ঋণের পরিমাণ ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি ৩২ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮৫ হাজার ৫৩৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ১৩ হাজার ১১১ কোটি ১১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৫ হাজার ২৫৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এর আগে চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি ডিএমটিসিএল পরিকল্পনা কমিশনকে জানিয়েছিল, প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৮৩ শতাংশ বেড়ে ৯৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এবার সংশোধিত প্রস্তাবে সেই ব্যয় আরও বেড়ে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

প্রকল্পটির নির্মাণকাজ ১২টি পৃথক কন্ট্রাক্ট প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে রামপুরা স্টেশনের উত্তর পাশ থেকে নতুন বাজার স্টেশন পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ অংশের কাজের জন্য নির্ধারিত সিপি-০৪ প্যাকেজের মূল ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৩৩০ কোটি ২০ লাখ টাকা। পরে জাপানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এর প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করে ১৩ হাজার ২৬৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। দরপত্রে জাপানের টোকিউ-এমআইএল জেভি সর্বনিম্ন ১৪ হাজার ৯৮৮ কোটি ৭ লাখ টাকা দর প্রস্তাব করে।

একইভাবে নদ্দা স্টেশনের উত্তর থেকে বিমানবন্দর স্টেশন পর্যন্ত পাতাল অংশের সিপি-০৬ প্যাকেজের মূল ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ৬০৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। কিন্তু জাপানের নিশিমাতসু-টোডা জেভি সর্বনিম্ন ১০ হাজার ৮২১ কোটি ৯১ লাখ টাকার দর প্রস্তাব করে।

১২টি প্যাকেজের মূল ব্যয় ছিল ৩৭ হাজার ৬৫৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। সর্বশেষ প্রাক্কলনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ হাজার ৯৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চ দরপ্রস্তাব ও প্রতিযোগিতার সীমাবদ্ধতা ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। জাপানি অর্থায়নের প্রকল্পে পরামর্শক ও ঠিকাদার নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান কিছু শর্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলাদেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের বিমানবন্দর রুটটি সম্পূর্ণ ভূগর্ভস্থ। বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১৯ দশমিক ৮৭২ কিলোমিটার এই অংশে ১২টি পাতাল স্টেশন থাকবে।

অন্যদিকে নতুন বাজার থেকে পিতলগঞ্জ ডিপো পর্যন্ত পূর্বাচল রুটের দৈর্ঘ্য ১১ দশমিক ৩৬৯ কিলোমিটার। এই অংশে সাতটি উড়াল ও দুটি পাতাল স্টেশন থাকবে।

প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে বিশেষজ্ঞরা জাতীয় সংসদসহ সর্বসাধারণের প্ল্যাটফর্মে খোলামেলা আলোচনা ও পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, এত বড় ব্যয় বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে ব্যয়ের তুলনা এবং প্রকল্পের ভবিষ্যৎ আর্থিক দায়ও সতর্কভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তৈরি একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশের মেট্রোরেল নির্মাণ ব্যয়ের তুলনাও তুলে ধরা হয়েছিল। সেখানে ঢাকার মেট্রোরেল নির্মাণ ব্যয় প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ২২৬ দশমিক ৭৪ থেকে ২৫৩ দশমিক ৬৩ মিলিয়ন ডলার হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যা ভারতের পাটনার তুলনায় প্রায় পাঁচগুণ বেশি।

প্রকল্পের ১২টি প্যাকেজের মধ্যে ডিপো এলাকার ভূমি উন্নয়ন সংক্রান্ত সিপি-০১ প্যাকেজের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। বাকি ১১টি প্যাকেজের ক্রয় প্রক্রিয়া বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।

ন্যাশনিক্স/এলকে

আরও নিবন্ধ

সর্বশেষ সংবাদ