জ্বালানিতে ১০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়; রেকর্ড আমদানি নাকি অর্থপাচার

অবশ্যই পরুন

বিশ্ববাজারের ঊর্ধ্বমুখী দাম ও বাড়তি চাহিদার দোহাই দিয়ে সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি তেল আমদানিতে রেকর্ড ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন (১ হাজার ৬৩ কোটি ৫০ লাখ) ডলার খরচ দেখিয়েছে বাংলাদেশ। দেশীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা। কিন্তু রেকর্ড এই অর্থ খরচের পরও দেশে জ্বালানি সংকট, পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন এবং ডলার বাজারে চরম টানাপোড়েন দেখে অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মনে জাগছে বড় প্রশ্ন—১০ বিলিয়ন ডলারের পুরোটাই কি সত্যি দেশে জ্বালানি আমদানিতে ব্যবহৃত হয়েছে, নাকি আমদানির আড়ালে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে?

​বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত অর্থবছরের মোট আমদানি ব্যয়ের ১৪ দশমিক ১৩ শতাংশই গেছে জ্বালানি খাতে, যা আগের অর্থবছরের (৫.১৪ বিলিয়ন ডলার) চেয়ে ১০৭ শতাংশ বেশি। অথচ আমদানির যে তথ্য খাতাপত্রে দেখানো হচ্ছে, বাস্তবে দেশে তেলের সরবরাহ ও বাজারে তার সুফলের মিল মিলছে না। এ কারণেই বিশ্লেষকদের একাংশ সন্দেহ প্রকাশ করছেন যে, জ্বালানি তেল আমদানির ভুয়া বা বাড়িয়ে দেওয়া দরপত্র (ওভার-ইনভয়েসিং) এবং আমদানি চুক্তির আড়ালে মোটা অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা পাচার হয়ে থাকতে পারে।

​অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি বা রাশিয়া-ইউক্রেইন কিংবা ইরান পরিস্থিতির প্রভাবে তেলের দাম বাড়লেও, এক বছরে আমদানি ব্যয় এক লাফে দ্বিগুণের বেশি হয়ে যাওয়া কোনো স্বাভাবিক চিত্র নয়। দেশে এলসি (ঋণপত্র) খোলায় কড়াকড়ি থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি খাতের মতো স্পর্শকাতর খাতকে ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ ডলার বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন। আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যের সাথে বাংলাদেশের আমদানিকৃত প্রতি ব্যারেল তেলের প্রকৃত ক্রয়মূল্যের একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ অডিট করা হলে এই সন্দেহ আরও স্পষ্ট হবে বলে তারা মনে করেন।

​জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিম সংকটের পেছনে সরবরাহের ঘাটতির চেয়ে ‘আতঙ্কিত কেনাকাটা’ (panic buying)-কে দায়ী করে বাজারে দেড় মাসের নিরাপদ মজুত রাখার তাগিদ দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, ১০ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড আমদানির পরও কেন বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন) ও জ্বালানি বিভাগকে সরবরাহে হিমশিম খেতে হচ্ছে? বিপুল এই আমদানির পরেও কেন নিশ্চিত হচ্ছে না মজুত নিরাপত্তা?

​অন্যদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও যুদ্ধের প্রভাবের কথা বললেও, বিশ্লেষকদের পাল্টা প্রশ্ন—চাহিদা মেটাতে গিয়ে যদি সত্যিই ১০ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়ে থাকে, তবে বাস্তবে তার প্রতিফলন কেন মিলছে না? ভোক্তা পর্যায়ে ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ টাকা লিটার দরে কিনেও সাধারণ মানুষ কেন জ্বালানি সংকটের শঙ্কায় ভুগবে?

​আমদানি চুক্তির মাধ্যমে অর্থ পাচারের এই জোরালো সন্দেহের সঠিক তদন্ত না হলে এবং জ্বালানি খাতের আমদানিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না আনলে—১০ বিলিয়ন ডলার কেন, ভবিষ্যতে আরও বেশি অর্থ খরচ করেও দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা অধরাই থেকে যাবে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।

আরও নিবন্ধ

সর্বশেষ সংবাদ