জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ এবং কয়লা সরবরাহে সমস্যার কারণে দেশে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। জ্বালানি সংকট ও মেরামতের কারণে ৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বর্তমানে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। চালু থাকা কেন্দ্রগুলোরও বড় অংশ পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে রাজধানীর বাইরের শিল্পাঞ্চল থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহে দেখা দিয়েছে বড় ঘাটতি।
বিতরণ কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে লোডশেডিং আগের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। গড়ে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে। গত রোববার বিকেল ৩টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। মাত্র ১০ ঘণ্টা পর রাত ১টায় সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে। এর আগে ৩ আগস্ট রাত ১টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট। আর ২০২৩ সালের ২৭ জুন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছিল ৩ হাজার ৪১৯ মেগাওয়াট।
গ্যাস সংকটেই বড় ধাক্কা
বিদ্যুৎ সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে গ্যাসের ঘাটতিকে চিহ্নিত করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ২৫২ কোটি ঘনফুট। লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজন অন্তত ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু বর্তমানে কেন্দ্রগুলো পাচ্ছে মাত্র প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস।
অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশেরও কম গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এর সঙ্গে জ্বালানি সংকট ও মেরামতের কারণে ৪১টি কেন্দ্র বন্ধ থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
একসময় গ্যাসচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো। বর্তমানে উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াটে। কিছুদিন আগেও এই খাত থেকে উৎপাদন ছিল সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি।
পুরো সক্ষমতায় ফেরেনি এলএনজি টার্মিনাল
গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর গ্যাস সরবরাহে বড় ঘাটতি দেখা দেয়। এতে দৈনিক প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায় এবং জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২১৪ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে।
প্রায় ১৫ দিন পর আংশিক মেরামতের মাধ্যমে টার্মিনাল থেকে ২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে এখনও এটি পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানিয়েছেন, টার্মিনালের মেরামত শেষ হতে আরও দুই থেকে তিন দিন লাগতে পারে। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি সপ্তাহেই গ্যাস সরবরাহ বাড়বে। পুরোপুরি সচল হলে টার্মিনাল থেকে অতিরিক্ত ৩০ থেকে ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু এলএনজি সরবরাহ বাড়ালেই দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান হবে না। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমার পাশাপাশি আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
কয়লা সরবরাহেও সমস্যা
গ্যাসের পাশাপাশি কয়লা সংকটও বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার পটুয়াখালী তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে কুতুবদিয়ায় বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে কয়লা খালাসে দেরি হওয়ায় কেন্দ্রটিতে কয়লা পৌঁছাতে সময় লাগছে।
ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি পাওয়ারের কেন্দ্র থেকেও বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ কমেছে। প্রায় ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও কয়েক দিন ধরে সরবরাহ ৮০০ থেকে ১ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে রয়েছে। ঝাড়খণ্ডে বন্যার কারণে কয়লা ভিজে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তবে কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হলে উৎপাদন পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে আদানি পাওয়ার।
দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ৯৪৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট। পায়রা কেন্দ্রের একটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণ শেষে চালু হওয়ায় উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে। অন্যদিকে রামপাল ও বড়পুকুরিয়ায় উৎপাদন কমেছে। বড়পুকুরিয়ার তিন ইউনিটের মধ্যে দুটি কারিগরি সমস্যায় বন্ধ রয়েছে।
তীব্র গরমে বাড়ছে ভোগান্তি
বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিনে ও রাতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে, আবার কোথাও একবার বিদ্যুৎ গেলে কয়েক ঘণ্টা পরও সরবরাহ ফিরছে না।
তীব্র গরমে ফ্যান, এসি ও পানির পাম্প চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং অনলাইনভিত্তিক কাজ। শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা পড়ছেন বেশি দুর্ভোগে।
সিলেটে সোমবার ২৪৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ২০২ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ৪৫ মেগাওয়াট। এর আগের দিন ঘাটতি ছিল ৫৬ মেগাওয়াট। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে রোববার রাতে নগরের টুকের বাজার এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন স্থানীয়রা।
বগুড়ার সান্তাহারেও চাহিদার তুলনায় অর্ধেকের কম বিদ্যুৎ সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে। সন্ধ্যার পর লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসা, শিক্ষা ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে।
শিল্পাঞ্চলেও বাড়ছে চাপ
বিদ্যুৎ সংকটের সঙ্গে আগে থেকেই থাকা গ্যাস সংকট যুক্ত হওয়ায় শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, বিদ্যুৎ চলে গেলে উৎপাদন লাইন বন্ধ হয়ে যায়। পরে বিদ্যুৎ ফিরলেও যন্ত্রপাতি স্বাভাবিকভাবে চালু করতে সময় লাগে।
উৎপাদন সচল রাখতে অনেক প্রতিষ্ঠানকে জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে জ্বালানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি উৎপাদন খরচও বেড়ে যাচ্ছে।
গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ
লোডশেডিং পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যুৎ সচিব পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের বরাদ্দ বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছেন।
যেসব কেন্দ্র দ্রুত জাতীয় গ্রিডে বাড়তি বিদ্যুৎ দিতে সক্ষম, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্যাস দেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কর্মকর্তাদের আশা, গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়বে এবং লোডশেডিং কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
তেলভিত্তিক উৎপাদনে বাড়তি ব্যয়
গ্যাস ও কয়লার ঘাটতি মোকাবিলায় তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে এই পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বেশি হওয়ায় সরকারের ভর্তুকির চাপও বাড়ে।
এ ছাড়া বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া পরিশোধ না হওয়ায় জ্বালানি তেল আমদানিতেও চাপ তৈরি হয়েছে। পিডিবির কর্মকর্তাদের মতে, সাময়িকভাবে তেলভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো গেলেও দীর্ঘ সময় এভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা ব্যয়বহুল। তাই গ্যাস ও কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক করাই গুরুত্বপূর্ণ।
কয়েক দিনের মধ্যে কিছুটা স্বস্তির আশা
পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম আশা করছেন, এক থেকে দুই দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতিতে কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তাঁর মতে, গ্যাস সংকটের পাশাপাশি কয়লা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় লোডশেডিং বেড়েছে। এ বিষয়ে পটুয়াখালী তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, এলএনজি টার্মিনাল পুরোপুরি সচল হলে দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ বাড়তে পারে। তবে গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তে থাকায় জ্বালানি সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলে লোডশেডিং একেবারে বন্ধ করা কঠিন হতে পারে।
দীর্ঘদিনের সমস্যারই বহিঃপ্রকাশ
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর বাড়তি নির্ভরতা এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তার সম্মিলিত প্রভাবেই পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়িয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও তা স্থায়ী সমাধান নয়। দীর্ঘমেয়াদে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, বিদ্যমান কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর কার্যকর ব্যবহার, গ্যাস ও বিদ্যুতের অপচয় রোধ এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে গুরুত্ব দিতে হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিমের মতে, দেশের জ্বালানি সংকট বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত সচল রাখতে প্রয়োজনে এলএনজি আমদানির পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানেও জোর দেওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় গ্রিডের দুর্বলতাও দায়ী
জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতির পাশাপাশি স্থানীয় সঞ্চালন অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাও কিছু এলাকায় সংকট বাড়াচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজারে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে প্রায় ১৪০ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি থাকছে প্রায় ৬০ মেগাওয়াট।
আড়াইহাজারে ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্রের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ২০২০ সালে। ২০২৩ সালে এটি চালুর কথা থাকলেও এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি। কোরিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী দল এলে অবশিষ্ট কাজ সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে শেষ করার সম্ভাবনা রয়েছে।
নতুন গ্রিডটি চালু হলে ভূলতা গ্রিডের ওপর চাপ কমবে এবং বিকল্প সঞ্চালন পথ তৈরি হবে। এতে রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজারে বিদ্যুৎ সরবরাহে কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি অব্যাহত থাকলে শুধু স্থানীয় অবকাঠামো উন্নত করে সার্বিক লোডশেডিং বন্ধ করা সম্ভব নয়।
