ঢাকা: বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম নৃশংস সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে বিবেচিত গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি ট্র্যাজেডির এক দশক পূর্ণ হয়েছে। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাজধানীর কূটনৈতিক এলাকায় সংঘটিত ওই হামলায় ১৭ জন বিদেশি নাগরিকসহ মোট ২০ জন নিরীহ মানুষ নিহত হন। পরদিন সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’-এর মাধ্যমে জঙ্গি হামলার অবসান ঘটানো হলেও, দশ বছর পরও বিচারিক প্রক্রিয়া পুরোপুরি শেষ হয়নি। একই সঙ্গে শত শত পলাতক জঙ্গিকে ঘিরে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হলি আর্টিজান হামলায় সহযোগিতার অভিযোগে বিচারিক আদালত সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। তবে ২০২৩ সালের অক্টোবরে হাইকোর্ট সেই রায় পরিবর্তন করে তাদের আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। বর্তমানে মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ‘লিভ টু আপিল’ পর্যায়ে রয়েছে। রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলের ভাষ্য অনুযায়ী, বিচারক সংকটসহ বিভিন্ন বাস্তব কারণে শুনানিতে বিলম্ব হলেও রাষ্ট্রপক্ষ দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
এদিকে মামলার অন্যতম দণ্ডিত আসামি আসলাম হোসেন ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে বন্দি পলায়নের ঘটনায় সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার সময় কারারক্ষীদের গুলিতে নিহত হন। ওই দিন কারাগার থেকে মোট ২০২ জন বন্দি পালিয়ে যায়, যা দেশের কারা নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দেয়।
পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৩১১ জন দাগি ও দণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গি দেশের ভেতরে ও বাইরে আত্মগোপনে রয়েছে। এদের মধ্যে নিষিদ্ধ সংগঠন জেএমবির ১৮৫ জন, আনসার আল ইসলামের ৮৩ জন, হুজি-বির ১৬ জন, নব্য জেএমবির ১৬ জন এবং হিযবুত তাহরীর ও আল্লাহর দলের আরও কয়েকজন সদস্য রয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় দেশের বিভিন্ন থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি বড় অংশ এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এসব অস্ত্র পলাতক জঙ্গিদের হাতে পৌঁছানোর ঝুঁকি থাকায় ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে বলে তারা মনে করছেন।
এছাড়া ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ১ হাজার ৬১১ জন জঙ্গি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ৩৮০ জন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জামিন লাভ করেন। মুক্তিপ্রাপ্তদের তালিকায় আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রতিষ্ঠাতা জসীম উদ্দিন রাহমানী এবং নিষিদ্ধ সংগঠন জেএমবির প্রধান মাওলানা সাইদুর রহমানের নামও রয়েছে। জসীম উদ্দিন রাহমানীর বিরুদ্ধে মুক্তির পর আবারও উগ্রবাদী মতাদর্শ প্রচারের অভিযোগ উঠেছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পলাতক ও জামিনপ্রাপ্ত জঙ্গিদের ওপর কার্যকর গোয়েন্দা নজরদারি বজায় রাখা জরুরি। তাদের মতে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, বিচারিক প্রক্রিয়ার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত তৎপরতাই ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলার ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
