তথ্য গোপন করে টাকা ছাপিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের গভর্নর

অবশ্যই পরুন

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে টাকা ছাপানোর পথ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ঘোষণা দিয়ে হোক বা গোপনে কোনো অবস্থাতেই অতিরিক্ত মুদ্রা ছাপানো উচিত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) ‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু: অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক-এর গভর্নর আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নেওয়ার পর টাকা না ছাপানোর চেষ্টা করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত মুদ্রা ছাপাতে হয়েছে এবং পরে তা স্বীকারও করতে হয়েছে। তার মতে, বাজার খুব দ্রুতই বুঝতে পারে অর্থের জোগান বেড়েছে কি না। পণ্য উৎপাদন না বাড়িয়ে টাকা সরবরাহ বাড়ালে মূল্যস্ফীতি অনিবার্য হয়ে ওঠে।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যে দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পেয়েছিল, বর্তমান সরকার তা থেকে কিছুটা খারাপ অবস্থায় দায়িত্ব নিয়েছে। বিশেষ করে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এখন ভঙ্গুর পর্যায়ে রয়েছে। বিগত সময়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও নীতিগত পদক্ষেপে প্রত্যাশিত ফল আসেনি। গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর তিন দফা নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করেন। কিন্তু এতে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে না কমে বরং ঋণের সুদহার ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত উঠে যায়, যা বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

একই ব্রিফিংয়ে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)-এর চেয়ারম্যান তাসকিন আহমেদ বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রাখা হলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বরং উৎপাদনমুখী কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে; গত ডিসেম্বর শেষে তা দাঁড়ায় ৬ দশমিক ১ শতাংশে। উচ্চ সুদহার শিল্প সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাধা দিচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বিনিময় হার জোর করে ধরে রাখার নীতিও কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। গত ছয় মাসে রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে কমে ডিসেম্বরে ঋণাত্মক ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমেছে, যা বৈশ্বিক বাজারে দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার জন্য উদ্বেগজনক।

এ পরিস্থিতিতে তাসকিন আহমেদ বর্তমান সরকারের কাছে নীতি সুদহার হ্রাসসহ বাস্তবভিত্তিক ও প্রবৃদ্ধিবান্ধব মুদ্রানীতির আহ্বান জানান। তার মতে, রাজস্ব ও মুদ্রানীতির সমন্বিত উদ্যোগ, নমনীয় তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং সামষ্টিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে।

সিপিডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে চারটি খাতে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার হ্রাস, টাকার বিনিময় হার বাজারভিত্তিক সমন্বয় এবং দায়দেনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককেই।

এ প্রসঙ্গে সিপিডির আরেক সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ডলারের দর পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কেনা বন্ধ করলে টাকার মান কিছুটা কমতে পারে। তবে এতে বড় ধরনের অবমূল্যায়ন বা অতিরিক্ত আমদানিনির্ভর মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হবে না বলেই তিনি মনে করেন।

তিনি আরও বলেন, রেমিট্যান্সে প্রদত্ত প্রণোদনা কিছুটা কমিয়ে বিনিময় হারকে আরও বাজারমুখী করা হলে টাকার মানের সীমিত সমন্বয়ের মাধ্যমে বিদ্যমান ঘাটতির একটি অংশ সামাল দেওয়া সম্ভব হতে পারে।

আরও নিবন্ধ

সর্বশেষ সংবাদ